সত্তরের নির্বাচনে স্বাধীনতার রায়

সত্তরের নির্বাচন ও বঙ্গবন্ধু

পশ্চিম পাকিস্তানের তো বটেই, এমনকি পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিবিদদের কেউ কেউ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ঘোষিত লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার এলএফও নাকচ করে দিয়েছিলেন। ১৯৭১-এর পর পূর্বাংশের, স্বাধীন বাংলাদেশের নাকচকারীদের মেনে নিতে হয়েছে এলএফও একটি বাঙালিবান্ধব নির্বাচন উপহার দিয়েছে। এলএফও ওয়ান ম্যান ওয়ান ভোট প্রতিষ্ঠা করেছে এবং পশ্চিম পাকিস্তানের চার প্রদেশের (সিন্ধু, বেলুচিস্তান, পাঞ্জাব ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ) এক ইউনিট ভেঙে দিয়েছে। ‘ওয়ান ম্যান ওয়ান ভোট’ কার্যকর করাতে জনসংখ্যা অনুপাতে জাতীয় পরিষদে ৩০০ আসনের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তান পেয়েছে ১৬২ আসন আর পশ্চিম পাকিস্তান পেয়েছে ১৩৮ আসন। আর প্রদেশগুলো ইউনিটের বন্ধনমুক্ত হওয়ায় ভোটাররা নিজ নিজ প্রদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাভকারী রাজনৈতিক দলকেই গুরুত্বপূর্ণ ভাবতে শুরু করেছেন।

৩০০ আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ পেয়েছে ১৬০ আসন, পাকিস্তান পিপলস পার্টি ৮১, জামায়াত-ই-ইসলামী চার, পাকিস্তান মুসলিম লীগ (কাউন্সিল) দুই, পাকিস্তান মুসলিম লীগ (কাইয়ুম) নয়, জামিয়াত ওলেমা-ই-ইসলাম সাত, মারকাজি জামিয়াত-উলেমা পাকিস্তান সাত, পাকিস্তান মুসলিম লীগ (কনভেনশন) সাত, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ওয়ালী) ছয়, পাকিস্তান ডেমোক্রাটিক পার্টি এক ও স্বতন্ত্র ১৬।

৩০০ আসনের সঙ্গে সংরক্ষিত নারী আসন ছিল ১৩টি। এর সাতটি পূর্ব পাকিস্তানের এবং ছয়টি পশ্চিম পাকিস্তানের চার প্রদেশের। এ সাতটিসহ আওয়ামী লীগের আসন সংখ্যা দাঁড়ায় ১৬৭।

আওয়ামী লীগের কাছ থেকে ফসকে যাওয়া দুটি আসনের একটি পেয়েছেন পিডিপিপ্রধান নুরুল আমিন, মান্দাইল আসন এবং অন্যটি পেয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী রাজা ত্রিদিব রায়, পার্বত্য চট্টগ্রাম।

নির্বাচনের এ ফলাফল পাকিস্তান সরকারসহ সব পর্যবেক্ষকের কাছেই ছিল অবিশ্বাস্য। ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার কে ব্লাড নির্বাচনোত্তর যে টেলিগ্রাম স্টেট ডিপার্টমেন্টে পাঠান তাতে স্পষ্টভাবেই বলে দেন, পূর্ব পাকিস্তান একদলীয় রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। এ লেখায় আর্চার ব্লাডের একটি পূর্ণাঙ্গ এবং একটি টেলিগ্রামের অংশ নির্বাচনোত্তর পরিস্থিতি নিয়ে অনেক কিছু ভেবেছেন, তা জানাতে ভাষান্তর করা হলো।

ব্লাড টেলিগ্রাম থেকে:

১. ৭ ডিসেম্বর ১৯৭০ (সাধারণ নির্বাচনে) বিপুল বিজয়ের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তান একদলীয় রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। পূর্ব পাকিস্তানের অন্যান্য রাজনৈতিক দল আক্ষরিক অর্থেই মূলোৎপাটিত হয়েছে। জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগের থাকবে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা, দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনৈতিক দল জুলফিকার আলী ভুট্টোর পাকিস্তান পিপলস পার্টির দ্বিগুণ আসন। আওয়ামী লীগের এ বিস্ময়কর বিজয় যত না একটি দলের বিজয়, তার চেয়ে বেশি একজন একক ব্যক্তির বিজয়, সর্বশক্তিমান এ দলের অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের বিজয়। ২. নির্বাচনের ফলাফলে সবচেয়ে কম বিস্মিত হয়েছেন শেখ নিজে। ২ জুন (১৯৭০) কনসুলেট জেনারেল কার্যালয়ের অফিসারদের সঙ্গে আলাপের সময় শেখ এমন সম্ভাবনাই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। যারা তার বিরোধিতা করে আসছে তাদের সম্পর্কে বলেন, আমি বেশি সদয় হতে পারছি না, তাদের দেখে নিতে জানি।

যদিও আইনগতভাবে শেখ এখনো ক্ষমতাসীন হননি। নির্বাচনের চোখ ধাঁধানো বিজয়ের খবর জেনে যাওয়ার পর থেকেই শেখ প্রকৃতপক্ষে ক্ষমতা প্রয়োগ করেই চলেছেন। পূর্ব পাকিস্তান প্রশাসন এর মধ্যেই অথর্ব হয়ে পড়েছে। এক অর্থে বলা যায়, প্রশাসন পরিবর্তনকে স্বীকার করে নিয়েছে। এতদিন সাদা পোশাকের সিআইডি ধরনের গোয়েন্দারা তার বাড়ির চারপাশ থেকে তার ওপর নজরদারি করে খোঁজখবর সরকারকে জানাত, এখন তাদের সরিয়ে প্রহরায় বসানো হয়েছে ইউনিফর্ম পরিহিত পুলিশ। ৩. মুজিব সারা জীবনই পূর্বকালীন রাজনীতিবিদ। আইনের একটি ডিগ্রি নিয়ে নিজে প্রতিষ্ঠান ছাড়ার পর লাভজনক কোনো চাকরিতে যাননি। তার দৃশ্যমান আয়টুকু আসে গ্রেট ইস্টার্ন ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির উপদেষ্টার প্রাপ্য থেকে। তার প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ১৯৫৬ থেকে দুই বছর আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বাধীন সরকারের বাণিজ্য, শ্রম ও শিল্পমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের; আওয়ামী লীগকে নিয়ন্ত্রণের দ্বন্দ্বে আতাউর রহমান খানের সঙ্গে তার ভাষণ ধরে এবং দ্বন্দ্বে বিজয়ী হয়ে তিনিই আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেন। ১৯৪৮ থেকে বিভিন্ন সময় তিনি ১০ বছর পাকিস্তানি কারাগারে কাটিয়েছেন আর তার কারাজীবন তুঙ্গে ওঠে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায়। আর তাই পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের কাছে তিনি জিন্দা শহীদের মর্যাদা পেয়েছেন এবং তারা তার এ ক্ষমতারোহণ নিশ্চিত করেছে। দীর্ঘ সংগ্রামের পর মুজিব এখন সাফল্য ও ক্ষমতার স্বাদ গ্রহণ করতে পারেন। ৪. মানুষ মুজিবকে বর্ণনা করা কঠিন। একান্ত আলোচনায় তিনি আকর্ষণীয়, শান্ত ও আত্মবিশ্বাসী। পার্থিবভাবে ভুট্টো ধাঁচের আভিজাত্য তার নেই। তিনি বেশ এমন করেছেন, আচরণে নগর মানুষের গুণাগুণসম্পন্ন। তিনি ইউরোপ বিশেষ করে যুক্তরাজ্য সম্পর্কে তিনি ভালোই অবহিত, চীন সম্পর্কেও। যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কেও অবহিত (আমাদের দূরদৃষ্টিসম্পন্ন কনসুলার জেনারেলকে ধন্যবাদ জানাতেই হয়। ১৯৫৮ সালে লিডার গ্র্যান্টে তাকে যুক্তরাষ্ট্র পাঠিয়েছিলেন।) বক্তৃতামঞ্চে তিনি অনলবর্ষী বক্তা, এক দৃষ্টিতেও তিনি লক্ষ মানুষকে জাদু করে আটকে রাখতে পারেন। দলের প্রধান হিসেবে তিনি কঠোর কর্তব্যপরায়ণ ও উদ্ধত। তার মধ্যে ঐশ্বরিক ত্রাণকর্তার মতো একটি ব্যাপার আছে—ব্যাপক গণভক্তি এটাকে আরো জোরদার করে তুলেছে। তিনি বলেন, ‘আমার জনগণ আমার জমিন, আমার অরণ্য, আমার নদী।’ এটা স্পষ্ট তিনি নিজের মধ্যে বাঙালির প্রত্যাশা প্রতিফলিত হতে দেখেন। ৫. যখন বাঙালিদের বঞ্চনার অভিযোগ করেন মুজিব নিজেকে আবেগতাড়িত ও আবেগমথিত অবস্থায় দেখেন। তাকে পদ্ধতিগত চিন্তাবিদ মনে হয় না, কিংবা পাণ্ডিত্যের মেজাজও তার নেই। তিনি মূলত একজন জননেতা, কাজ করে দেখানোর মানুষ। তার বিরুদ্ধে কুৎসা রটনাকারীরা তার বুদ্ধিবৃত্তিক ঘাটতি, নীতিহীন সুবিধাবাদ ও ক্ষমতালোভের কথা বলে। তিনি ক্ষমতার তীব্র প্রত্যাশী। ৬. পররাষ্ট্র বিষয় নিয়ে মুজিব নিজেকে সামান্যই জড়িয়েছেন। দাপ্তরিকভাবে তিনি ‘যথার্থ নিরপেক্ষতার অনুসারী সেন্টো ও সিয়াটো থেকে বেরোনোর পক্ষে, ভারতের সঙ্গে উন্নত সম্পর্কের প্রত্যাশী।’ ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়ন তার জন্য সবচেয়ে চাপের এবং উদ্বেগকর বিষয়। কারণ পূর্ব পাকিস্তান সমস্যার আংশিক সমাধান তিনি দেখেছেন প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বর্ধিত বাণিজ্যিক সম্পর্কের মধ্যে। অনেক বাঙালির মতো মুজিব কাশ্মীর প্রশ্নে কঠোর নন (রেকর্ডে নাম থাকার জন্য যতটুকু থাকা প্রয়োজন, ততটুকুই)। অনেক বাঙালির মতো তিনিও মনে করেন, ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কোন্নয়নের মধ্য দিয়ে ফারাক্কা সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হবে। কনসুলেটের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনায় তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি প্রসন্ন বলেই মনে হয়েছে। মুজিব দুবার চীন ভ্রমণ করেছেন—একবার পিকিং শান্তি সম্মেলনে এবং ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানি শুভেচ্ছা মিশনে। তিনি স্বীকার করেছেন, চীনের (সাম্যবাদী) নিরীক্ষা বেশ আকর্ষণ করার মতো, কিন্তু রাজনীতিক পর্যবেক্ষক হিসেবে তাদের রাজনীতির কারণে বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞাসহ নিপীড়নকারী একটি সমাজও তার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

আর্চার ব্লাডের এ টেলিগ্রামটির বিষয়বস্তু অবিসংবাদিত শেখ মুজিবুর রহমান।

২৯ জানুয়ারি ১৯৭১ আর্চার ব্লাড স্টেট ডিপার্টমেন্টে একটি দীর্ঘ এয়ারগ্রাম পাঠান। এর বিষয় ছিল আওয়ামী লীগ বিশ্লেষণ। আর রিপোর্ট থেকে সম্ভাব্য মন্ত্রী-উপদেষ্টাদের অংশ তুলে ধরছি:

পদবী ও নাম

প্রধানমন্ত্রী: শেখ মুজিবুর রহমান; প্রেসিডেন্ট: এএম ইয়াহিয়া খান; স্পিকার : জহিরউদ্দিন আহমদ এমএনএ; পররাষ্ট্রমন্ত্রী: ড. কামাল হোসেন এমএনএ;

গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী: সৈয়দ নজরুল ইসলাম এমএনএ; অর্থমন্ত্রী বা অর্থনৈতিক পরিকল্পনাপ্রধান: রেহমান সোবহান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; বাণিজ্যমন্ত্রী: মতিউর রহমান (ঢাকা চেম্বারের প্রেসিডেন্ট) অথবা এম আর সিদ্দিকী (চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী) দুজনই এমএনএ; মুখ্য সচিব: ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, এমপি; কূটনৈতিক পদ: কামরুদ্দিন আমেদ ও আলমগীর রহমান।

‘থ্রি নট থ্রি’তে চাকরিচ্যুত কর্মকর্তাদের কেউ গুরুত্বপূর্ণ পদে আসতে পারেন। আর্চার ব্লাড রেহমান সোবহানকে দেখেছেন বামপন্থী অর্থনীতিবিদ হিসেবে। কামরুদ্দিন আহমদ আইনজীবী ও সাবেক কূটনীতিবিদ এবং আলমগীর রহমান তেল কোম্পানির জেনারেল ম্যানেজার। মুজিবের ইনার সার্কেলে থাকবেন তাজউদ্দীন আহমদ ও সৈয়দ নজরুল ইসলাম। (আংশিক)

আর্চার ব্লাড যে সরকারের চিন্তা করেছিলেন, সংসদ অধিবেশন স্থগিত এবং ২৫ মার্চের হত্যাযজ্ঞে সব গুঁড়িয়ে দেয়। তিনি দেখিয়েছেন ভোটের ফলাফলেই একটি রাষ্ট্র তৈরি হয়ে গেছে, বাস্তবে তা-ই হয়েছে।

আর্চার ব্লাডের কোনো প্রতিবেদনই স্টেট ডিপার্টমেন্ট পছন্দ করেনি। ১৯৭১-এর জুনে তাকে প্রত্যাহার করা হয় এবং সিনেট ফরেন রিলেশন কমিটির কাছে জবাবদিহি করতে নির্দেশ দেয়া হয়।

এম এ মোমেন: সাবেক সরকারি কর্মকর্তা

Leave A Reply

Your email address will not be published.