রূপগঞ্জের ঘটনায় বহির্বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে: সালমান এফ রহমান

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে হাসেম ফুডসের কারখানায় আগুনে ৫২ জন শ্রমিক পুড়ে মারা যাওয়ার ঘটনায় বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান।

কারখানায় নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিতকরণে গঠিত কমিটির আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। শুক্রবার(১৬ জুলাই) অনলাইনে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, কারখানার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রীর ‘বিশেষ ইচ্ছায়’ এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বিষয়টিকে সিরিয়াস সমস্যা হিসেবে নিয়েছেন। অতি দ্রুত আমরা কারখানা পরিদর্শন শেষে সংস্কারের রিকমেন্ডেশনগুলো তৈরি করে ফেলবো। এরপর স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আলোকে সংস্কার কাজ শুরু হবে।

প্রসঙ্গত, কলকারখানা, শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে দুর্ঘটনা রোধে এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিতকরণে বৃহস্পতিবার (১৫ জুলাই) ২৪ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে সরকার। এই কমিটির সভাপতি করা হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানকে। সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান মো. সিরাজুল ইসলাম, শ্রম সচিব কে এম আবদুস সালাম, দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন উপস্থিত ছিলেন।

সালমান এফ রহমান বলেন, ‘রূপগঞ্জের ঘটনায় দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে সরাসরি কোনও প্রভাব না পড়লেও পরোক্ষভাবে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।’ তিনি উল্লেখ করেন, অগ্নিকাণ্ডের পর নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় সম্পাদকীয় ছাপা হয়েছে। আরও অনেক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে এ নিয়ে খবর প্রকাশিত হয়েছে। এই ঘটনায় আমাদের দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। তিনি বলেন, ‘তৈরি পোশাকসহ রফতানি খাতের কলকারখানার কমপ্লায়েন্স বা উন্নত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। এখন দেশীয় খাতের কল কারখানাগুলোর কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করা দরকার। আমরা চাচ্ছি, বিডা, এফবিসিসিআই, বিজিএমইএ এবং কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতরের (ডিআইএফই) সমন্বয়ে গঠিত দল প্রতিটি জেলার শিল্পকারখানা পরিদর্শন করবে। তারপর পরিদর্শন অনুযায়ী, ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে দুর্ঘটনা রোধে এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য গঠিত কমিটি ঈদ ও বিধিনিষেধের পর সভা করবে।’

উল্লেখ্য, গত সপ্তাহে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে হাসেম ফুডসের কারখানায় আগুনে ৫২ জন শ্রমিক পুড়ে মারা যান।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, ‘কারখানা পরিদর্শনে অতীতে কী সমস্যা হয়েছিল, সেটি চিহ্নিত করা না গেলে এগোনো যাবে না। সে জন্যই কাজটির সঙ্গে বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। ডিআইএফইর ত্রুটি-বিচ্যুতিও জাতীয় কমিটি পর্যবেক্ষণ করবে। প্রয়োজনে আইন পরিবর্তন করে নতুন পরিদর্শন সংস্থা করা যায় কিনা, সে চিন্তাও করা হবে।’

ডিআইএফইর কার্যক্রমে সমস্যা আছে বলেই প্রধানমন্ত্রী এই উদ্যোগ নিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, ‘রানা প্লাজা ধসের পর অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের অধীনে পোশাক কারখানাগুলো পরিদর্শন করা হয়। এই দুই সংস্থার হয়ে যারা কাজ করেছেন, তাদের দিয়ে প্রাথমিকভাবে পরিদর্শন কাজ শুরু করার চিন্তাভবনাও করছি আমরা।’

সালমান এফ রহমান বলেন, ‘পোশাক শিল্পে আমরা সফলতার সঙ্গে শিশুশ্রম বন্ধ করতে পেরেছি। বাংলাদেশের অন্য শিল্পখাতেও আমরা শিশুশ্রম বন্ধ করতে চাই। বর্তমানে ডিআইএফই, ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদফতরসহ বিভিন্ন দফতর বিভিন্ন বিষয়ে পরিদর্শন করে। এতে করে সমস্যা তৈরি হয়। সে জন্য সমন্বিত একটি পরিদর্শন সংস্থা করা যায় কিনা, ভেবে দেখা হবে।’

বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান বলেন, ‘রফতানিমুখী শিল্পকারখানার কর্মপরিবেশ উন্নত হবে আর অন্য কারখানার হবে না, সেটি যুক্তিযুক্ত না। দেশীয় কারখানায় যারা কাজ করেন, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সরকারের দায়িত্ব। সে জন্য প্রধানমন্ত্রী অনুশাসন দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রজ্ঞাপনের পরপরই গতকাল (১৫ জুলাই) রাতে সহকর্মীদের সঙ্গে বৈঠক করেছি। আগামী ১৯ জুলাই এফবিসিসিআই, বিজিএমইএ-সহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে আরেকটি সভা করার পরিকল্পনা রয়েছে।’

শ্রমসচিব কে এম আবদুস সালাম বলেন, ‘সরকার নতুন উদ্যোগ নিলেও ডিআইএফইর কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। ডিআইএফই শিল্পকারখানার পরিদর্শনে মূলত শ্রম অধিকারের বিষয়ে বেশি জোর দেয়। তার বাইরে অগ্নি, বৈদ্যুতিক ও ভবনের কাঠামোগত বিভিন্ন বিষয় দেখার প্রয়োজন রয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘পোশাকশিল্পের কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করতে গিয়ে অন্যান্য খাতে যথাযথ নজর দিতে পারেনি ডিআইএফই। এ জন্য লোকবলের সংকটকে দায়ী করেন শ্রমসচিব।’

এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি জসিম উদ্দিন বলেন, ‘বড় ধরনের কোনও দুর্ঘটনা ঘটলে তৈরি পোশাকশিল্পসহ সারা দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। কিন্তু দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যেভাবে বেড়েছে, সেভাবে সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরের সক্ষমতা বাড়েনি। দেশে যত শিল্পকারখানা রয়েছে, সেগুলো তদারকি করার মতো সক্ষমতা নেই ডিআইএফইর।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের একটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান করা দরকার, যেটি শিল্পকারখানার কর্মপরিবেশ তদারকি করবে। এটি সরকারি-বেসরকারি যৌথ অংশীদারত্বে হতে পারে।’

এর আগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে বৃহস্পতিবার (১৫ জুলাই) শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে দুর্ঘটনা রোধে এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিতকরণে ২৪ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। এতে বলা হয়, ‘কলকারখানা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অগ্নিদুর্ঘটনা এবং অন্যান্য দুর্ঘটনারোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিডার নেতৃত্বে এফবিসিসিআই, বিজিএমইএসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে অবিলম্বে সব শিল্পকারখানা সরেজমিনে পরিদর্শনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।’

Leave A Reply

Your email address will not be published.