রাজশাহী মেডিকেলে প্রতিদিন লাগছে ৮ হাজার লিটার অক্সিজেন

করোনায় যেন মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতাল। আজ রোববার সকাল ৮টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালের করোনা ইউনিটে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। রাজশাহী ও আশপাশের জেলাগুলোতে করোনা সংক্রমণের হার ওঠানামা করলেও রামেক হাসপাতালে মৃত্যুর মিছিল থামছেই না। চলতি মাসের ২৭ দিনে হাসপাতালের করোনা ইউনিটে মোট ৩০৪ জন রোগীর মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর হার অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।

বিভাগীয় শহর রাজশাহীর এই হাসপাতালটি উত্তরাঞ্চলের একমাত্র সেন্ট্রাল অক্সিজেন সমৃদ্ধ হাসপাতাল। তাই শুধু রাজশাহী নয়, বিভাগের আট জেলার পাশাপাশি রংপুর ও খুলনা বিভাগের রোগীরা এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। করোনাকালে যেসব রোগীর অক্সিজেন স্যাচুরেশন নিচে নেমে যাচ্ছে, অর্থাৎ যাদের অক্সিজেন দিতে হচ্ছে, তাদের চাপ প্রতিদিনই বাড়ছে। রোগীর চাপ এতটাই বেড়েছে যে, প্রতিদিন শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যে সব রোগী আসছে, তাদের অক্সিজেন স্যাচুরেশন ৯০-এর নিচে নামলেই শুধু ভর্তি নেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ যাদের অক্সিজেন প্রয়োজন হচ্ছে, শুধু তাদের ভর্তি করা হচ্ছে। বাকিদের ব্যবস্থাপনাপত্র দিয়ে বাড়ি থেকেই চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দিচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। আজ রোববার সকাল পর্যন্ত রামেক হাসপাতালের করোনা ইউনিটে চিকিৎসাধীন রোগী ছিলেন ৪৩৪ জন। তাদের সবাইকে দিতে হচ্ছে অক্সিজেন সাপোর্ট।

হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. শামীম ইয়াজদানী জানান, হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) ২০টি শয্যা ও কেবিনের ১৫টি শয্যা ছাড়াও পর্যায়ক্রমে ১০টি ওয়ার্ডকে করোনা ডেডিকেটেড ওয়ার্ড হিসেবে রূপান্তর করা হয়েছে। এসব ওয়ার্ডকে সেন্ট্রাল অক্সিজেনের আওতায় নিয়ে আসার পর করোনা রোগীদের ভর্তি করা হয়েছে। সব মিলিয়ে হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডে এখন শয্যা সংখ্যা ৩৫৭টি। সেখানে গতকাল শনিবার সকাল পর্যন্ত রোগী ভর্তি ছিল ৪৩৪ জন। অতিরিক্ত রোগীদের মেঝে ও বারান্দায় রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। সেখানে সিলিন্ডারের মাধ্যমে অক্সিজেন সাপোর্ট দেওয়া হচ্ছে।

পরিচালক জানান, হাসপাতালে করোনা রোগীর চাপ এতোটাই বেড়ে যাচ্ছে যে, ৪৮ শয্যার আরও একটি ওয়ার্ডকে করোনা ইউনিটের আওতায় নিয়ে আসা হচ্ছে। ওয়ার্ডটিতে সেন্ট্রাল অক্সিজেনের সংযোগ দেওয়া হচ্ছে। আজকালের মধ্যে ওয়ার্ডটি চালু করা হলে করোনা ইউনিটে শয্যা সংখ্যা দাঁড়াবে ৪০২টি।

শামীম ইয়াজদানী বলেন, ‘অক্সিজেন দেওয়ার প্রয়োজন নেই—এমন করোনা আক্রান্ত রোগীদের স্থান সংকুলানের অভাবে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও আমরা ভর্তি নিতে পারছি না। এমন পরিস্থিতিতে হাসপাতালে অন্যান্য রোগীদেরও চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। কিডনি ডায়ালাইসিস করতে হয় এমন রোগী, হার্টের রোগী, প্রসূতি ও দুর্ঘটনার কারণে হাড়ভাঙা রোগী ছাড়া অন্য কোনো রোগীকে আমরা আপাতত হাসপাতালে ভর্তি করতে পারছি না।’

রামেক হাসপাতালের পরিচালক আরও বলেন, ‘হাসপাতালের ডেন্টাল ইউনিটটি, যা এক সময় সদর হাসপাতাল ছিল, সেখানে ১০০ শয্যার হাসপাতাল চালু করার জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে আমরা প্রস্তাব দিয়েছি। ১০০ শয্যার সদর হাসপাতালটি চালু করা হলে রামেক হাসপাতালের কয়েকটি ওয়ার্ডের রোগীকে আমরা সেখানে স্থানান্তর করব। তখন আরও কয়েকটি ওয়ার্ডকে আমরা করোনা ডেডিকেটেড ওয়ার্ডে রূপান্তর করতে পারব।’

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. শামীম ইয়াজদানী বলেন, ‘হাসপাতালের করোনা ইউনিটের রোগীদের জন্য প্রতিদিন প্রায় আট হাজার লিটার অক্সিজেন লাগছে। এখন রোগীদের অক্সিজেন সরবরাহ করাটাই আমাদের কাছে একটি চ্যালেঞ্জের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। অক্সিজেন সরবরাহ আরও নিরবচ্ছিন্ন রাখতে আরেকটি অক্সিজেন ‘ভ্যাপোরাইজার’ লাইন লাগানো হয়েছে।’

শামীম ইয়াজদানী বলেন, ‘অক্সিজেনের জন্য আমাদের বাড়তি প্রস্তুতি রাখা হয়েছে, যাতে রোগী বেশি হলেও ব্যবস্থা করা যায়। আমাদের ১৮৩টি অক্সিজেন কনসেনট্রেটর রয়েছে। বর্তমানে ৭২৫টি অক্সিজেন সিলিন্ডার মজুদ রাখা হয়েছে। একটি রোগীর অনেক অক্সিজেন লাগছে। এ জন্য অনেক সিলিন্ডার দরকার হচ্ছে। আরও ২০০ সিলিন্ডারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।’

পরিচালক বলেন, ‘করোনা রোগীদের জন্য আমাদের ২০টি আইসিইউ শয্যা রয়েছে ও ৬৯টি হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলা রয়েছে, যা প্রায় আইসিইউর সমতুল্য। ২০টি আইসিইউ শয্যার বিপরীতে রোগী ভর্তির আবেদন জমা পড়েছে শতাধিক। ফলে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য এগুলো আরও বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।’

Leave A Reply

Your email address will not be published.