ভ্যাকসিন নিয়ে তড়িঘড়ি করা যাবে না

করোনাভাইরাস ভ্যাকসিন নিরাপদ ও কার্যকর প্রমাণিত হওয়ার আগে এর প্রয়োগ নিয়ে ফেডারেল সরকারকে সতর্ক করেছেন ভ্যাকসিন বিশেষজ্ঞরা। তাদের উদ্বেগ যে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালগুলো সম্পন্ন হওয়ার আগেই যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) কভিড-১৯ ভ্যাকসিনের জরুরি ব্যবহারে অনুমোদন (ইইউএ) দিতে পারে। এফডিএর কর্তৃত্ব রয়েছে পর্যাপ্ত বা অনুমোদিত বিকল্প নেই, এমন জরুরি পরিস্থিতিতে অগ্রহণযোগ্য চিকিৎসা পণ্যগুলো ব্যবহারের অনুমোদন দেয়ার। যদিও এটা সম্পূর্ণ অনুমোদন নয় এবং এটা যেকোনো সময় প্রত্যাহার করা হতে পারে।

সাধারণভাবে একটি ভ্যাকসিন এফডিএ অনুমোদিত হতে বিজ্ঞানীদের অবশ্যই ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক স্বেচ্ছাসেবীর শরীরে প্রয়োগ করে প্রমাণিত হতে হবে যে এটা কোনো রোগের বিরুদ্ধে মানুষকে রক্ষা করতে নিরাপদ ও কার্যকর। তথ্য সংগ্রহের পর এফডিএ পরামর্শদাতারা সাধারণত কয়েক মাস ধরে এগুলো বিবেচনা করে। তবে ইইউএ অনেক দ্রুত ঘটে। অন্যথায় ভ্যাকসিনগুলোর পুরো ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল প্রক্রিয়া এবং এফডিএ অনুমোদনের প্রক্রিয়াটি পেরোতে কয়েক বছর সময় লেগে যেতে পারে। এর আগে যখন ভ্যাকসিন তৈরির প্রক্রিয়াটি ত্বরান্বিত করা হয়েছে তখন কিন্তু খারাপ ফলাফল দেখেছে বিশ্ববাসী।

১৯৫৫ সালের ১২ এপ্রিল সরকার শিশুদের পোলিওর বিরুদ্ধে সুরক্ষার জন্য প্রথম ভ্যাকসিন ঘোষণা করে। কয়েক দিনের মধ্যে ল্যাবগুলোতে হাজার হাজার ভ্যাকসিন তৈরি করা হয়েছিল। একটি সংস্থার তৈরি ভ্যাকসিনের ব্যাচে দুর্ঘটনাক্রমে লাইভ পোলিও ভাইরাস ছিল এবং এটি প্রাদুর্ভাব ঘটায়। সে সময় দুই লাখেরও বেশি শিশু পোলিও ভ্যাকসিন পেয়েছিল। তবে কয়েক দিনের মধ্যেই সরকার এ কর্মসূচি থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিনের ইতিহাস কেন্দ্রের পরিচালক এবং শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. হাওয়ার্ড মার্কেল বলেছেন, ওই ঘটনায় ৪০ হাজার শিশু পোলিওতে আক্রান্ত হয়। কিছু শিশুর ওপর এটা নিম্নমাত্রায় ছিল, কয়েকজন শিশু পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল এবং প্রায় ১০ জন শিশু মারা গিয়েছিল।

এছাড়া ১৯৫৫ থেকে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পোলিও ভ্যাকসিন সিমিন ভাইরাস (এসভি৪০) দ্বারা দূষিত হয়েছিল। এ ঘটনায় কোনো শিশু মারা না গেলেও অনেক শিশু অসুস্থ হয়ে পড়েছিল এবং ভাইরাসটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল। কিছু গবেষণা ভাইরাসটির সঙ্গে ক্যান্সারের সম্ভাব্য যোগসূত্র দেখায়। তবে ইউএস সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) জানিয়েছে, বেশির ভাগ গবেষণায় কোনো যোগসূত্র পাওয়া যায়নি। বর্তমান কোনো ভ্যাকসিনে এসভি ৪০ ভাইরাস নেই এবং দূষণের ফলে কারো ক্ষতি হয়েছে এমন কোনো প্রমাণ নেই।

১৯৫৫ সালে পোলিও ভ্যাকসিনের ঘটনায় ভ্যাকসিন নিয়ে মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন গ্রহণের বিরোধিতা করে কিছু মানুষ নানা প্রচারণা চালাচ্ছে।

মার্কেল বলেন, এমনিতেই ভ্যাকসিন নিয়ে কিছু মানুষের ভেতরে অবিশ্বাস রয়েছে। তার ওপর শেষ পর্যায়ের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালগুলো সম্পন্ন হওয়ার আগে জরুরি অনুমোদন দেয়া বিরাট বোকামি হবে। যদিও এফডিএ কমিশনার স্টিফেন হ্যান বলেছেন, ভ্যাকসিনের সিদ্ধান্ত রাজনীতির ভিত্তিতে নয়, বরং তথ্যের ভিত্তিতে হবে।

কিন্তু তার পরও উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে। আর এটি কয়েকটি ক্ষতি ডেকে আনবে। প্রথমত ভ্যাকসিন নিরাপদ নাও হতে পারে। দ্বিতীয়ত, এটা নিরাপদ না হলে লোকেরা ভ্যাকসিনের প্রতি বিশ্বাস হারাবে। তৃতীয়ত, যদি কোনো ভ্যাকসিন সম্পূর্ণ সুরক্ষা না দেয় তাহলে লোকজন সুরক্ষার বিষয়ে ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করবে এবং তাদের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলবে। চতুর্থত, একটি নিম্নমানের ভ্যাকসিন ইইউএ পেলে ভালো ভ্যাকসিনটিতে এর প্রভাব পড়বে, কারণ লোকেরা ট্রায়ালে নাম লেখাতে অনীহা প্রকাশ করবে।

আরও পড়ুন
Loading...