বাঙালির অস্থিমজ্জায় মিশে আছেন বঙ্গবন্ধু

গুলি আর কামানের শব্দে ঘুম ভেঙেছিল- জাহাঙ্গীর কবির নানক

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সপরিবারের হত্যা হওয়ার স্মৃতিচারণ করে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, ‘১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসবেন। বঙ্গবন্ধুর আগমনকে কেন্দ্র করে আগের রাতে আমরা রাত ১টা পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থান করি। অনুষ্ঠানের সকল কার্যক্রম সম্পাদন করে বাসায় এসে ঘুমিয়ে পড়ি খুব সকালে উঠতে হবে বলে। কিন্তু ১৫ আগস্ট সকালে আমার ঘুম ভাঙে গুলি আর কামানের শব্দ। মুহূর্তেই জানতে পারি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারের হত্যা করা হয়েছে। সেদিন আমরা ছাত্রলীগের কর্মীরা ঢাকার রাস্তায় ও অলিগলিতে ঘুরেছি, নেতাদের বাড়ি বাড়ি ঘুরেছি বঙ্গবন্ধুকে হত্যার প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য। কিন্তু দায়িত্বশীল কেউ প্রতিরোধ করলো না। সেদিন বুঝতে পারিনি, কে কাক আর কে কোকিল, কে হত্যার সাথে জড়িত— কে হত্যার সাথে জড়িত নয়। সেটি বোঝা আমাদের জন্য কষ্টসাধ্য বেপার ছিলো।’ তিনি আরও বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু সপরিবারের হত্যার প্রতিবাদে সর্বপ্রথম ২১ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা বিক্ষোভ মিছিল করি। ছাত্রলীগের একটা বিরাট অংশ তিলে তিলে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিরোধ ও প্রতিশোধ গড়ে তুলতে থাকি। ছাত্রলীগের সাবেক নেতা অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হলো— সেটি কি উর্বর কোনো মস্তিষ্কের সিদ্ধান্ত ছিলো! বিষয়টি ছিলো এমন— কয়েকজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা মদপান করে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করতে গিয়েছিল! বঙ্গবন্ধু হত্যার বিষয়টি তেমন নয়। বিষয়টি ছিলো সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। সেই ষড়যন্ত্রের শেকড় ছিলো অনেক গভীরে। অথচ সেদিন সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত ও দলের দায়িত্বশীল নেতারা কেউ বঙ্গবন্ধুকে সতর্ক করলেন না। কেন বঙ্গবন্ধুকে পরিপূর্ণ নিরাপত্তা দেয়া হলো না। যারা দায়িত্বে ছিলেন— তারা কী করলেন বঙ্গবন্ধুর জন্য। তারা কিছুই করেননি। উল্টো বাঙালি জাতিকে এক রক্তাক্ত ইতিহাস উপহার দিলেন। খুনিরা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর বঙ্গভবন দখল করলো। সেদিন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে পরিচিত যারা— তারা এই হত্যার বিরুদ্ধে একটু প্রতিবাদও করলেন না। হয় সেদিন ওই নেতারা হত্যার ষড়যন্ত্রের সাথে জড়িত ছিলেন, নয়তো কাপুরুষতা ছিলো, তাদের খুনিদের প্রতি দুর্বলতা ছিলো, অথবা হত্যার সাথে সরাসরি জড়িত ছিলো।’ আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক আরও বলেন, ‘দেশ স্বাধীনের পর জাতির বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আমরা একটি রাষ্ট্র গঠনের চেষ্টা করেছিলাম। আমরা ক্ষমতার অট্টালিকায় গা ভাসিয়ে দেইনি। কিন্তু আমাদের দলের মাঝে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। এই বিশৃঙ্খলা কেন্দ্রে থেকে জেলা উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছে যায়। একদিকে পাকিস্তানি পরাজিত শক্তি, অন্যদিকে রাজাকার আলবদর আলশামসের ষড়যন্ত্র। আবার দলের মধ্যে বিশৃঙ্খলা।’ তিনি আরও বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু কখনো ভৌগোলিক স্বাধীনতা চাননি, তিনি সবসময় অর্থনৈতিক স্বাধীনা চেয়েছেন, অর্থনৈতিক শোষণ থেকে স্বাধীনতা চেয়েছেন, বাঙালি জাতিকে স্বাধীন রাষ্ট্র দিতে চেয়েছিলেন। নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন মানুষের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ সকল মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দেশে যখন অর্থনৈতিক অবকাঠামো উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে— ঠিক সেই মুহূর্তে ষড়যন্ত্র শুরু হলো। স্বাধীনতার পরাজিত শক্তি ও পাকিস্তানের প্রেতাত্মারা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করলো। বঙ্গবন্ধুহীন বাংলাদেশে আমরা এতিমের মতো রাজনীতি করেছি। অনিশ্চয়তার পথে রাজনীতি করেছি। নানামুখী ষড়যন্ত্রের মুখে রাজনীতি করেছি। বঙ্গবন্ধুহীন নেতৃত্বশূন্য হলো আওয়ামী লীগ। নেতৃত্ব কে দেবেন। ঠিক সেই মুহূর্তে দেশে ফিরে দলের হাল ধরেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। তিনি ফিরে এসেছিল বলেই আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগসহ সকল নেতাকর্মীর আশ্রয়স্থল সৃষ্টি হয়েছিল। আমরা নতুন করে স্বপ্ন দেখলাম পিতা হত্যার আন্দোলন সৃষ্টি করার। প্রতিবাদ প্রতিরোধের জাগরণ সৃষ্টি করার।’

Leave A Reply

Your email address will not be published.