তালেবান ঠেকাতে বিস্ময়করভাবে ব্যর্থ শক্তিশালী আফগান বাহিনী

আফগানিস্তান দখলের একেবারে দ্বারপ্রান্তে দেশটির সশস্ত্র বিদ্রোহীগোষ্ঠি তালেবান। এরইমধ্যে দেশটির ৩৪টি প্রদেশের ২০টিরই দখল নিয়েছে তারা। ঢুকে পড়েছে রাজধানী কাবুলের ভেতরেও। বলা হচ্ছে, কাবুলের পতন এখন কেবল সময়ের ব্যাপার।

এদিকে আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত বিশাল আফগান সরকারি বাহিনী যে তালেবানের এই আগ্রাসনের মুখে মোটেও দাঁড়াতে পারছে না, তাতে অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।

এক আধুনিক আফগান সামরিক বাহিনী গঠনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গত ২০ বছর বিপুল অর্থ ব্যয় করেছে। এ বাহিনীর সদস্যসংখ্যা প্রায় তিন লাখ, যা তালেবান বাহিনীর চার গুণ। এদের জন্য প্রতিটি বড় শহরে নির্মাণ করা হয়েছে সর্বাধুনিক সেনাছাউনি। আধুনিক সমরাস্ত্র তো রয়েছেই, আরও আছে প্রায় দেড় শ যুদ্ধবিমান–সংবলিত বিমানবাহিনী। তা সত্ত্বেও এত দ্রুত কীভাবে আফগান প্রতিরোধ ভেঙে পড়ছে, কেউই স্পষ্টভাবে সে ব্যাখ্যা দিতে পারছে না।

কোনো কোনো মার্কিন মহলে কারণ হিসেবে আফগান সরকারের ভেতর দুর্নীতির কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সরকারি দুর্নীতির কারণে কীভাবে সেনাবাহিনীর শিরদাঁড়া ভেঙে গেল, তার কোনো ব্যাখ্যা নেই।

আসল কারণ অন্যত্র, যার একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন কাবুলের আমেরিকান ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ওবায়দুল্লাহ বাহির। তার মতে, যে সামাজিক বৈষম্যের কারণে একসময় তালেবানের উত্থান হয়েছিল, ২০ বছরের মার্কিন অধিগ্রহণে তা বিলুপ্ত হয়নি, বরং আরও জেঁকে বসেছে। ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতি আগের চেয়ে ব্যাপকতর আকার নিয়েছে। মার্কিন আগমনের পর শহরে আলগা কিছু পরিবর্তন হলেও যে গ্রাম সে গ্রামই রয়ে গেছে। এসব গ্রাম থেকে তালেবান কখনোই সরে যায়নি। বস্তুত, এ পুরো সময়েই তালেবান গ্রামাঞ্চলে একটি বিকল্প প্রশাসন চালিয়ে গেছে।

তালেবানের সঙ্গে আপস আলোচনা

মার্কিনরা আফগানিস্তান ছেড়ে যাচ্ছে—তেমন জল্পনা-কল্পনা কয়েক বছর ধরেই চলছে। আফগান সমস্যার সামরিক সমাধান নেই, অতএব তালেবানের সঙ্গে একটি সমঝোতা চুক্তি প্রয়োজন, সে লক্ষ্যে তালেবানের সঙ্গে বছর দশেক আগে গোপনে আলাপ-আলোচনা শুরু হয়েছিল। ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর সে আলোচনা বেগবান হয়ে ওঠে। গত বছর ট্রাম্প প্রশাসনের উদ্যোগে কাতারের রাজধানী দোহায় তালেবান নেতৃত্বের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে একটি শান্তিচুক্তিও অনুমোদিত হয়। এ আলোচনায় তালেবানের আপত্তির কারণে কাবুলের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত আশরাফ গনি সরকারকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। মার্কিন এ সিদ্ধান্ত তালেবানকে আরও বেপরোয়া করে তোলে। তারা ধরে নেয়, কাবুল সরকারের সঙ্গে কোনো আগাম সমঝোতার আদৌ কোনো প্রয়োজন নেই।

গত বছর ট্রাম্প ঘোষণা করেন, ২০২১ সালের মে মাসের মধ্যে ইরাক ও আফগানিস্তান থেকে অধিকাংশ মার্কিন সৈন্য সরিয়ে আনা হবে। এই ঘোষণার পর এ কথা স্পষ্ট হয়ে যায়, কাবুল সরকারকে জলাঞ্জলি দিতে ওয়াশিংটনের কোনো আপত্তি নেই।

গ্রামাঞ্চলে তালেবানের বিকল্প সরকার

শহরের বাইরে অধিকাংশ আফগানির কাছে কাবুলের মার্কিনসমর্থিত সরকার কখনোই পুরোপুরি বৈধতা পায়নি। দেশের সর্বত্র মার্কিন বাহিনীর উপস্থিতি এ বৈধতা–হীনতাকে আরও জোরদার করে তোলে। যাদের ঘাড়ে বন্দুক রেখে দেশ শাসন করা হয়েছে, তারাই যখন পালাচ্ছে, তখন তালেবান বিদ্রোহের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ অর্থহীন—এমন একটি সিদ্ধান্ত থেকে আফগান সরকার ও প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যরা তাদের করণীয় ঠিক করে নিয়েছে বলেই মনে হয়। তারা বুঝতে পেরেছে, বাঁচতে হলে তালেবানের সঙ্গে হাত মেলানোই শ্রেয়।

আফগানিস্তানের ঘটনাবলি যার ঘনিষ্ঠভাবে অনুসরণ করে, তাদের অনেকের মতে, আফগানদের কাছে মার্কিন সামরিক অধিগ্রহণ যেমন কখনোই গ্রহণযোগ্য হয়নি, তেমনি গ্রহণযোগ্য হয়নি মার্কিন প্রশাসনের অভিভাবকত্বে কাবুলের পশ্চিমা ধাঁচের গণতান্ত্রিক সরকার। এটি ইরাকে মার্কিন অধিগ্রহণ ও তাদের তত্ত্বাবধানে নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে তুলনীয়। যে নামে বা যেভাবেই ডাকি, আফগানিস্তানে অথবা ইরাকে গত ২০ বছরে যা ঘটেছে, তা ঔপনিবেশিক আগ্রাসন ছাড়া আর কিছু নয়।

আফগান ইতিহাস থেকে আমরা জানি, একাধিক বিদেশি বাহিনী এখানে অধিগ্রহণের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। সে কারণে আফগানিস্তানের অন্য নামে ‘সাম্রাজ্যবাদের কবরস্থান’ (গ্রেভ ইয়ার্ড অব এম্পায়ার)। এ কবরস্থানের সর্বশেষ শব হতে চলেছে আমেরিকা।

আফগানিস্তানে আমেরিকার দুই শিক্ষা

আমেরিকার ব্যর্থতা থেকে দুটি শিক্ষালাভের কথা আমরা বলতে পারি। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য যেকোনো বৃহৎ শক্তির পক্ষে যুদ্ধে জেতা যত সহজ, শান্তি অর্জন তত সহজ নয়। এক মাসেরও কম সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ২০০১ সালে তালেবান সরকারকে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। এরপর গত ২০ বছর তারা ব্যয় করেছে সেখানে নিজেদের পছন্দমতো ‘শান্তি’ প্রতিষ্ঠায়। তাতে ব্যর্থ হয়ে এখন নিজের ঘরে ফিরে যাচ্ছে।

দ্বিতীয়ত, স্থানীয় জনগণের পূর্ণ অংশগ্রহণ ছাড়া ভিনদেশি চিন্তাভাবনার ভিত্তিতে দেশ গঠন সম্ভব নয়। যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল তার নিজের আদলে—অর্থাৎ পশ্চিমা ধাঁচে—আফগানিস্তানে একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা নির্মাণ। ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া সে রাষ্ট্রব্যবস্থা নির্মাণ সম্ভব নয়, আমরা আবারও একবার তার প্রমাণ পেলাম।

অনেকেই বলছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান ছেড়ে চলে গেলে তার শূন্যস্থান পূরণ করতে এগিয়ে আসবে চীন। কয়েক বছর ধরেই চীন আফগানিস্তানে বড় মাত্রায় বিনিয়োগ করছে, তাদের মূল আগ্রহ দেশটির মূল্যবান খনিজ সম্পদ আহরণ। চীনের বিশ্বাস, নিকট মিত্র পাকিস্তানকে ব্যবহার করে সে দেশের ওপর নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হবে। তালেবান তাদের উইঘুর মুসলমানদের সঙ্গে চলতি বিবাদ দমনে সাহায্য করবে—চীনের এমন ভাবনাও রয়েছে। চীনের কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ঝাং জিয়াডং সম্প্রতি লিখেছেন, রাশিয়া বা আমেরিকার মতো বড় ভুল চীন করবে না। অভ্যন্তরীণ জটিলতায় যুক্ত না হয়েই দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করার সুযোগ তার রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা অবশ্য সতর্কতা ব্যক্ত করে বলেছেন, আফগানিস্তানের ওপর নিজের কর্তৃত্ব চাপিয়ে দেওয়ার ভুল করলে চীনের পরিণতি যুক্তরাষ্ট্র বা সোভিয়েত ইউনিয়নের চেয়ে ভিন্ন কিছু হবে না। মার্কিন টিভি ভাষ্যকার গর্ডন জি চ্যাং লিখেছেন, সামান্য পা হড়কালে চীনকেও আফগানিস্তানের কবরে আশ্রয় নিতে হবে।

সমালোচনার মুখে বাইডেন

আফগানিস্তানের কবরে আশ্রয় এড়াতে সে দেশ থেকে চলে আসার যে সিদ্ধান্ত তারা নিয়েছে, বাইডেন প্রশাসনের জন্য তা গভীর শিরঃপীড়ার কারণ হয়ে উঠেছে। মার্কিন সমরবিদেরা পরামর্শ দিয়েছিলেন, সামরিক উপস্থিতি পুরোপুরি প্রত্যাহারের বদলে কয়েক হাজার সৈন্য এখানে রেখে দেওয়া হোক। প্রেসিডেন্ট বাইডেন তাতে সম্মত হননি। তাঁর কথা, ‘ফগান সরকার টিকল কি না, সেটা আমার মাথাব্যথা নয়। এখন থেকে আরও ২০ বছর পরেও যদি আমরা সে দেশ ছেড়ে আসি, আজকের সমস্যা নতুন করে ধরা দেবে।’

কিন্তু যে দ্রুততায় তালেবান কাবুলের দিকে ধেয়ে আসছে, তা বাইডেন প্রশাসনকে রীতিমতো বিস্মিত করেছে। তারা ভেবেছিল, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সব মার্কিন সৈন্য ও কূটনৈতিক–কর্মীকে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। প্রায় ৩০ হাজার আফগান নাগরিক, যারা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছে, তাদেরও নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এর ওপর রয়েছে মার্কিন দূতাবাসের অসংখ্য গোপন নথিপত্র, সেগুলোর প্রতিটি পুড়িয়ে ফেলতে হবে। এ সবকিছু সমলে নিরাপদে সরে আসতে কম করে হলেও কয়েক মাস প্রয়োজন। কিন্তু ঘটনা যে খাতে বইছে, তাতে মনে হচ্ছে মাস খানেকের মধ্যেই তালেবান কাবুল দখল করবে।

নিরাপদে সরে আসার জন্য যে হুড়োহুড়ি শুরু হয়েছে, তাতে অনেকে ভিয়েতনাম যুদ্ধ শেষে সায়গন থেকে মার্কিন কূটনীতিকদের হেলিকপ্টার ও বিমানযোগে পালানোর ঘটনার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা করছেন। হাজার হাজার ভিয়েতনামি, যারা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে কাজ করেছে, পালানোর আশায় তাদের কেউ কেউ সে সময় হেলিকপ্টারের দরজায় ঝুলে থাকার চেষ্টা করে। কেউ কেউ মাটিতে ছিটকে পড়ে। সেই একই ঘটনা আবার ঘটতে যাচ্ছে, সে কথা উল্লেখ করে বিরোধী রিপাবলিকান পার্টির নেতা মিচ ম্যাককনেল বলেছেন, এমন একটা বিপর্যয় যে ঘটতে যাচ্ছে, তা তো জানাই ছিল। তারপরও যে প্রশাসন যথাযথ ব্যবস্থা নেয়নি, তার সব দায়িত্ব প্রেসিডেন্ট বাইডেনের। তিনি দাবি করেছেন, তালেবান ঠেকাতে আবার বোমাবর্ষণ শুরু করা হোক।

অনেকের ধারণা, কাবুলে সত্যি সত্যি যদি তালেবান ক্ষমতা গ্রহণ করে, তাহলে হয়তো আফগানিস্তান পুনরায় ইসলামি উগ্রপন্থীদের ঘাঁটিতে পরিণত হবে। আল-কায়েদা ও ইসলামিক স্টেটের প্রতিনিধিরা ইতিমধ্যেই মার্কিন প্রস্থানকে তাদের বিজয় বলে উল্লাস প্রকাশ করেছে। এ বছর এপ্রিলে সিএনএনের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে পাকিস্তানে অবস্থানরত দুই তালেবান নেতা ঘোষণা করেন, তাঁদের লক্ষ্য যত দ্রুত সম্ভব ইসলামি শরিয়া আইনের প্রবর্তন। ইসলামি বিশ্বের যেখানেই আমেরিকা রয়েছে, তাদের বহিষ্কার না করা পর্যন্ত তারা থামবেন না বলে ঘোষণা করেন।

আফগানিস্তানে যদি সত্যি সত্যি দ্বিতীয়বারের মতো তালেবান ক্ষমতায় ফিরে আস, তাহলে ধর্মীয় অনুশাসনের নামে মানবাধিকারের লঙ্ঘন প্রায় অনিবার্য। জানা গেছে, যেসব শহরে তালেবান ক্ষমতা দখল করেছে, সেখানে ইতিমধ্যেই মেয়েদের স্কুল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, কর্মক্ষেত্রে মেয়েদের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পাকিস্তানি পত্রিকা ডন জানিয়েছে, তালেবান কর্তৃপক্ষ এসব শহরে দাঁড়ি কামানো ও সিগারেট সেবন নিষিদ্ধ করেছে। ভয় হচ্ছে, গত ২০ বছরে আফগান নারীদের পক্ষে শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে যে অগ্রগতি অর্জন সম্ভব হয়েছে, তার সবই হয়তো ব্যর্থ হতে চলেছে। অস্ট্রেলিয়ার ডিকিন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক গ্রেগ বার্টন লিখেছেন, তালেবান–নিয়ন্ত্রিত আফগানিস্তানে নতুন যে ইসলামিক আমিরাত প্রতিষ্ঠিত হবে, তা সিরিয়া বা ইরাকে প্রতিষ্ঠিত ইসলামিক স্টেটের চেয়ে অনেক শক্তিশালী, অনেক ব্যাপক হবে। এ ইসলামিক আমিরাত সর্বত্র জিহাদপন্থী উগ্রবাদীদের কাছে এক অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে। আবারও সবাই এখনে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ভিড় করবে। মনে রাখা ভালো, এই তালেবান আশ্রয় থেকেই ওসামা বিন লাদেন নাইন–ইলেভেনের ভয়াবহ হামলার পরিকল্পনা করেছিলেন।

তালেবানের ক্ষমতায় আরোহণ বাংলাদেশের মতো দেশের জন্যও কম ভয়ের কথা নয়। নব্বইয়ের দশকে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বাংলাদেশি নাগরিক আফগানিস্তানে আল-কায়েদা ও তালেবান বাহিনীর সঙ্গে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। আফগানিস্তানে মার্কিন হামলা শুরু হলে তাদের অধিকাংশ বাংলাদেশে ফিরে আসে। আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতায় ফিরে এলে এরা পুনরায় চাঙা হবে—এ কথা ভাবার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

Leave A Reply

Your email address will not be published.