জাকাত প্রদানের উত্তম পদ্ধতি

জাকাত ইসলামের পাঁচটি ভিত্তিসমূহের তৃতীয় ভিত্তি। যা ইসলামে মৌলিক ইবাদতসমূহের মধ্যে অন্যতম ইবাদত। জাকাত শব্দের অর্থ হচ্ছে الطهارة والنماء والبركة والمدح পবিত্রতা, বৃদ্ধি, বরকত ও প্রশংসা।

আল মুজামুল অসীতে আছে, জাকাতের আভিধানিক অর্থ زكا , যে জিনিস ক্রমশ বৃদ্ধি পায় ও পরিমাণে বেশী হয়। زكا فلان অমুক ব্যক্তি জাকাত দিয়েছে অর্থ-সুস্থ ও সুসংবদ্ধ হয়েছে। অতএব, জাকাত হচ্ছে বরকত, পরিমাণে বৃদ্ধি পাওয়া, প্রবৃদ্ধি লাভ, পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা, শুদ্ধতা- সুসংবদ্ধতা।

ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় জীবন যাত্রার অপরিহার্য প্রয়োজন পূরণের পর নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদ পূর্ণ এক বছরকাল অতিক্রম করলে ওই সম্পদ থেকে নির্দিষ্ট অংশ আল্লাহর নির্ধারিত খাতে ব্যয় করাকে জাকাত বলা হয়। ইসলামী বিশ্বকোষ এর ভাষ্যমতে, আল-কোরআনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৮২ বার জাকাতের কথা বলা হয়েছে। আল-কোরআনে প্রত্যক্ষভাবে ৩২ বার জাকাত এর কথা বলেছেন। এর মধ্যে নামাজ ও জাকাতের কথা একত্রে বলেছেন ২৮ বার। ফুয়াদ আব্দুল বাকী বর্ণনা করেছেন, আল- কোরআনে মোট ১৯টি সুরায় ২৯টি আয়াতে জাকাত শব্দটির উল্লেখ দেখা যায়। জাকাত প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَأَقِيمُواْ الصَّلاَةَ وَآتُواْ الزَّكَاةَ وَارْكَعُواْ مَعَ الرَّاكِعِينَ

‘তোমরা নামাজ কায়েম কর, জাকাত প্রদান কর এবং রুকুকারীদের সঙ্গে রুকু কর’।  (সুরা বাক্বারা, আয়াত- ৪৩)।

জাকাত পরিশোধ না করার পরিণাম
জাকাত দিবে না কিংবা অস্বীকারকারীদের কঠোর ও ভয়াবহ শাস্তির ভয় প্রদর্শন করা বর্ণিত হয়েছে হাদীসে। এখানে ভয় প্রদর্শনের মূলে চেতনাহীন মন মানসে চেতনা সৃষ্টি এবং লোভী ও স্বার্থপর মানুষকে দানশীল বানানোর উদ্দেশ্যে নিহিত আছে। মানবতার বন্ধু মুহাম্মদ (সা.) জাকাত দানে উৎসাহ প্রদান ও ভয় প্রদর্শনের মাধ্যমে লোকদেরকে কর্তব্য পালনে উদ্বুদ্ধ করেছেন।

পরকালীন শাস্তি
জাকাত প্রদান না করলে তার ভয়াবহ শাস্তি বর্ণনায় কোরআনের ভাষ্য:
وَٱلَّذِينَ
يَكۡنِزُونَ ٱلذَّهَبَ وَٱلۡفِضَّةَ وَلَا يُنفِقُونَهَا فِي سَبِيلِ ٱللَّهِ فَبَشِّرۡهُم بِعَذَابٍ أَلِيمٖ ٣٤ يَوۡمَ يُحۡمَىٰ عَلَيۡهَا فِي نَارِ جَهَنَّمَ فَتُكۡوَىٰ بِهَا جِبَاهُهُمۡ وَجُنُوبُهُمۡ وَظُهُورُهُمۡۖ هَٰذَا مَا كَنَزۡتُمۡ لِأَنفُسِكُمۡ فَذُوقُواْ مَا كُنتُمۡ تَكۡنِزُونَ [التوبة:৩৪-৩৫]

‘আর যারা স্বর্ণ ও রৌপ্য পুঞ্জীভুত করে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না, তাদেরকে মর্মান্তক শাস্তির সংবাদ দাও। যে দিন জাহান্নামের অগ্নিতে তা উত্তপ্ত করা হবে এবং তা দ্বারা তাদের ললাট, পার্শ্বদেশ ও পৃষ্ঠদেশে দাগ দেয়া হবে, সেদিন বলা হবে এটাই তা যা তোমরা নিজেদের জন্য পুঞ্জীভুত করতে। সুতরাং তোমরা যা পুঞ্জীভূত করেছিলে তা আস্বাদন কর। (সূরা তাওবা: ৩৪-৩৫)।

﴿ٱلَّذِينَ يَبۡخَلُونَ وَيَأۡمُرُونَ ٱلنَّاسَ بِٱلۡبُخۡلِ وَيَكۡتُمُونَ مَآ ءَاتَىٰهُمُ ٱللَّهُ مِن فَضۡلِهِۦۗ وَأَعۡتَدۡنَا لِلۡكَٰفِرِينَ عَذَابٗا مُّهِينٗا ﴾[النساء:৩৭]

যারা কৃপণতা করে এবং মানুষকে কৃপণতার নির্দেশ দেয় এবং আল্লাহর নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে যা দিয়েছেন তা গোপন করে, আর আমি আখিরাতে কাফিরদের জন্য লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছি।

শাস্তির ভয়াবহতা হাদীস থেকে :
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: “مَنْ آتَاهُ اللَّهُ مَالًا، فَلَمْ يُؤَدِّ زَكَاتَهُ مُثِّلَ لَهُ مَالُهُ يَوْمَ القِيَامَةِ شُجَاعًا أَقْرَعَ لَهُ زَبِيبَتَانِ يُطَوَّقُهُ يَوْمَ القِيَامَةِ، ثُمَّ يَأْخُذُ بِلِهْزِمَتَيْهِ – يَعْنِي بِشِدْقَيْهِ – ثُمَّ يَقُولُ أَنَا مَالُكَ أَنَا كَنْزُكَ، ثُمَّ تَلاَ: (لَا يَحْسِبَنَّ الَّذِينَ يَبْخَلُونَ) ” الآيَةَ

আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, আল্লাহ যাকে ধন-মাল দিয়েছেন, সে যদি তার জাকাত আদায় না করে, তা হলে কিয়ামতের দিন তা একটি বিশধর অজগরের যার দুচোখের উপর দুটো কালো চি‎হ্ন রয়েছে রূপ ধারণ করবে। বলবে, আমিই তোমার ধন-মাল, আমিই তোমার সঞ্চয়। অত:পর রাসূল (সা.) এর আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন-

وَلَا يَحْسَبَنَّ الَّذِينَ يَبْخَلُونَ بِمَا آتَاهُمُ اللَّهُ مِن فَضْلِهِ هُوَ خَيْرًا لَّهُم ۖ بَلْ هُوَ شَرٌّ لَّهُمْ ۖ سَيُطَوَّقُونَ مَا بَخِلُوا بِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ۗ وَلِلَّهِ مِيرَاثُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۗ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ

আর আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে যা তোমাদেরকে দিয়েছেন তাতে যারা কৃপণতা করে, তাদের জন্য এটা মঙ্গল, এটা যেন তারা মনে না করে। না এটা তাদের জন্য অমঙ্গল। যাতে তারা কৃপণতা করবে কিয়ামতের দিন সেটাই তাদের গলায় বেড়ি হবে। আসমান ও জমিনের স্বত্বাধিকারী একমাত্র আল্লাহরই। তোমরা যা কর আল্লাহ তা বিশেষভাবে অবগত আছেন। (সুরা আলে ইমরান: ১৮০)
হযরত আলী (রা:) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে,
عن عليٍّ  قال:  لَعَنَ رسولُ اللهِ  آكِلَ الرِّبَا ومُوكِلَهُ وشَاهِدَهُ وكَاتِبَهُ والواشمة والمستوشمة، ومَانِعَ الصَّدَقَةِ، والمحلِّلَ والمحَلَّلَ لَهُ

আল্লাহ রাসূল (সা.) বলেন, ‘সুদখোর, সুদদাতা, উহার সাক্ষী ও লেখক, উল্কি অংকনকারিণী এবং যে নারী উল্কি অংকন করায়, অভিশপ্ত ওই ব্যক্তি যে যাকাত দিতে অস্বীকার করে, হিল্লাকারী ও যার জন্য হিল্লা করানো হয়, এদের সকলের ওপর আল্লাহর অভিশাপ বা লা’নত। (আহমাদ ও নাসায়ী)।

এজন্য যাদের উপর জাকাত ফরজ হয়েছে, সময়মতো জাকাত প্রদান করে দেয়াই একান্ত কর্তব্য। নিসাবের মালিক হওয়ার পর এক বৎসর অতিবাহিত হলেই সঙ্গে সঙ্গে জাকাত ওয়াজিব হয়। বিলম্ব করা জায়েয নাই। তবে বর্ষপূর্তির পূর্বে আদায় করা জায়েয।

জাকাত প্রদানের খাত :
জাকাত কারা পাবে এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسَاكِينِ وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا وَالْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ وَفِي الرِّقَابِ وَالْغَارِمِينَ وَفِي سَبِيلِ اللهِ وَابْنِ السَّبِيلِ ۖ فَرِيضَةً مِّنَ اللهِ ۗ وَاللهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ ﴿التوبة ﴾

কোরআনের এ আয়াত অনুযায়ী যাদের মাঝে জাকাত বিতরণ করা যাবে তারা হলেন:
১. ফকীর: এরূপ গরীব মানুষ, যার বেঁচে থাকার মত খুব সামান্য সহায় সম্বল রয়েছে বা নেই।
২. মিসকীন: এমন অভাবী, যার রোজগার তার নিজের ও নির্ভরশীলদের অপরিহার্য প্রয়োজনসমূহ মেটানোর জন্য যথেষ্ট নয়।
৩. আমিলীন: প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যাকাত সংগ্রহ ও বিতরণ কাজে নিয়োজিত কর্মচারীবর্গ।
৪. মুয়াল্লাফাতিল কুলূব: এমন নও-মুসলিম যার ঈমান এখনও পরিপক্ক হয়নি; অথবা ইসলাম গ্রহণ করতে ইচ্ছুক এমন কোনো অমুসলিম, যাদের চিত্ত দ্বীন ইসলামের প্রতি আকর্ষিত ও উৎসাহিত করা আবশ্যক। এরূপ ব্যক্তিদের জাকাত প্রদান করা যাবে, যাতে তারা ঈমান গ্রহণ করে এবং তাদের ঈমান পরিপক্ক হয়।
৫. রিকাব: ক্রীতদাসের দাসত্ব মোচনের জন্য মুক্তিপণ প্রদান।
৬. গারিমীন: ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির ঋণ পরিশোধের জন্য।
৭. ফী সাবীলিল্লাহ: আল্লাহর রাস্তায় নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ, যারা ইসলামের প্রচার প্রতিষ্ঠায় সক্রিয়ভাবে নিয়োাজিত; এবং
৮. ইবনুস-সাবীল: মুসাফিরের পাথেয়, অর্থাৎ-অর্থাভাবে বিদেশ-বিভূঁইয়ে আটকে-থাকা মুসাফির।

ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে জাকাত উত্তোলন ও বণ্টনের দায়িত্ব সরকারের। আল-কোরআনে রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব সম্পর্কে বলা হয়েছে- ‘আমি তাদের রাষ্ট্র ক্ষমতায় আধিষ্ঠিত করলে তারা সালাত কায়েম করবে, জাকাত আদায় করবে, সৎ কাজের আদেশ দেবে এবং অসৎ কাজে নিষেধ করবে; আর প্রত্যেক কাজের পরিণাম আল্লাহরই’ (আল-হাজ্জ : ৪১)।

বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও ইসলামী রাষ্ট্র না হওয়ায় এখানে সরকারি ব্যবস্থাপনায় জাকাত উত্তোলন ও বণ্টনের কোনো সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ নেই। তাই এদেশের মুসলমানগণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে জাকাত প্রদান করে থাকেন। তারা মাদরাসা, লিল্লাহ বোর্ডিং কিংবা ফকির-মিসকিনকে বিচ্ছিন্নভাবে যাকাতের অর্থ প্রদান করে থাকেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, ব্যক্তিগত পর্যায়ে শাড়ি-লুঙ্গি বিতরণ বা স্বল্প পরিমাণ নগদ অর্থ বিতরণের ফলে সমাজ থেকে দারিদ্র্যবিমোচন হচ্ছে না। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা-বিপর্যয়ও লক্ষ্য করা যায়। শাড়ি-লুঙ্গি বিতরণে সময় বিশৃঙ্খলার জন্য অনেকের প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে।

অন্যদিকে যদিও কোনো কোনো সংগঠন বা সংস্থা যাকাত আদায় ও বণ্টন করে থাকে তবে তাদের মাঝে পারস্পরিক সমন্বয়হীনতা লক্ষ্য করা যায়। ফলে জাকাত যে দারিদ্র্যবিমোচন ও সামাজিক নিরাপত্তার গ্যারান্টি, তারও সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। জাকাতের মূল উদ্দেশ্য হলো, জাকাত গ্রহীতাকে আত্মনির্ভশীল করে তোলার মাধ্যমে গ্রহীতার পর্যায় থেকে দাতার পর্যায়ে উন্নীত করা। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশে প্রচলিত জাকাত পদ্ধতির ফলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ভাগ্যের কোনো পরির্বতন তো হচ্ছেই না, বরং তাদের দারিদ্র্যকে লালন করা হচ্ছে।

আমাদের এদেশে জাকাত দাতা ও গ্রহীতা উভয়ের মাঝে অসুস্থ মানসিকতা লক্ষ্য করা যায়। দাতা অনুগ্রহ করে দেন এবং গ্রহীতা অসম্মানজনকভাবে দয়া হিসেবে তা গ্রহণ করেন। গ্রহীতাদের নিজের ঘরে ডেকে এনে করে যাকাত দেন। কেউ কেউ জাকাত প্রদান করা হবে মর্মে ঘোষণা দিয়ে লোক জড়ো করে জাকাত দেন। অথচ ইসলামের সুস্পষ্ট বক্তব্য হচ্ছে, জাকাত একটি ফরজ ইবাদত। এটি কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়। ধনীদের সম্পদে এটা হচ্ছে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর নির্ধারিত অধিকার।

মহান আল্লাহ বলেন- ‘তাদের ধন-মালে প্রার্থনাকারী ও বঞ্চিতদের হক রয়েছে’ (যারিয়াত : ১৯)। অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন- ‘সেইসব লোক মনের সঙ্কীর্ণতা থেকে মুক্ত, যাদের ধন সম্পদে প্রার্থনাকারী ও বঞ্চিতদের একটা নির্দিষ্ট হক (অধিকার) রয়েছে’ (মা’আরিজ : ২৪-২৫)। আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন, ‘ফসল কর্তনের দিনে তার নির্ধারিত হক (অধিকার) দিয়ে দাও’ (আল-আন’আম : ১৪১)। উপরোক্ত আয়াতসমূহ থেকে এটা প্রতীয়মান হয়, ধনীদের সম্পদে দরিদ্র ও অসহায় জনগোষ্ঠীর নির্ধারিত হক (অধিকার) রয়েছে। অতএব জাকাত ও উশর প্রদান দরিদ্রের প্রতি অনুগ্রহ নয়; বরং তাদের নির্দিষ্ট অধিকার প্রদান। তাদেরকে ডেকে এনে নয়, বরং তাদের ঘরে ঘরে গিয়ে জাকাত প্রদান করা কর্তব্য এবং সুন্দর কাজ।

আরও পড়ুন
Loading...