কারাগারে কষ্টে আছেন মিন্নি, চিকিৎসার আবেদন

বহুল আলোচিত বরগুনার শাহ নেওয়াজ রিফাত শরীফ (২৬) হত্যাকাণ্ডের দুই বছর পূর্তি হলো আজ। ২০১৯ সালের ২৬ জুন বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে বন্ড বাহিনীর হামলায় খুন হন রিফাত। এ ঘটনায় নিহত রিফাতের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকে হত্যাকাণ্ডের প্রধান পরিকল্পনাকারী উল্লেখ করে ফাঁসির আদেশ দেন আদালত। ২০২০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর বরগুনা জেলা ও দায়রা জজ আদালত এ রায় দেন। রায়ের পর বর্তমানে গাজীপুরের কাশিমপুর মহিলা কারাগারে আছেন মিন্নি।

এ দিকে রিফাত হত্যাকাণ্ডের মামলার রায় ঘোষণার নয় মাস পরও মিন্নিকে নির্দোষ দাবি করেছেন তাঁর বাবা মো. মোজাম্মেল হোসেন কিশোর। আজ শনিবার বিকেলে তিনি এনটিভি অনলাইনকে বলেন, “মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পর মিন্নিকে কাশিমপুর কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। বরগুনা থেকে আসা-যাওয়া কষ্ট। করোনার কারণে এখন মিন্নির সঙ্গে সরাসরি দেখা-সাক্ষাৎ করা যাচ্ছে না। সপ্তাহে একবার পাঁচ মিনিট করে ফোনে কথা বলার সুযোগ হয়। মিন্নিকে ‘কেমন আছো’ জিজ্ঞাসা করতেই কান্নায় ভেঙে পড়ে, আর কথা বলতে পারে না। গত বুধবার মিন্নি কারাগার থেকে ফোন দিয়েছিল। সে জানিয়েছে, কারাগারে পানি পর্যন্ত খেতে পারছে না, ঘুমাতে পারে না। মিন্নি বলেছে, তার বুকে ও মাথা ব্যথা, দাঁতে প্রচণ্ড ব্যথা। কারা কর্তৃপক্ষ মিন্নির চিকিৎসার জন্য ঊর্ধ্বতন মহলে আবেদন করেছে। যদি তারা দয়া করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে, তাহলে ভালো হয়।”

পরিবারের অবস্থা বর্ণনা করে মোজাম্মেল হোসেন কিশোর আরও বলেন, ‘মিন্নির শোকে আমার পরিবারে সবাই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে। মিন্নির মা ও ছোট ভাই-বোন সব সময় মিন্নির শূন্যতা অনুভব করে। পুরো বাড়িতে মিন্নির স্মৃতি খুঁজে ফিরি। মেয়ের শোকে মিন্নির মা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েছে।’

মোজাম্মেল হোসেন কিশোর দাবি করেন, “রিফাত হত্যায় মিন্নি কোনোভাবেই দোষী না এবং ও (মিন্নি) কোনো পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত ছিল না। এটা কেউ প্রমাণও করতে পারেনি। কুচক্রী মহল মিন্নিকে এই মামলায় জড়িয়ে ফাঁসির দণ্ডে দণ্ডিত করেছে। মিন্নিও আমার কাছে বলেছে, ‘আব্বু আমি দোষী না। আমি সম্পূর্ণ নির্দোষ। উচ্চ আদালতে আমি বেকসুর খালাস পাব।’ সত্যের জয় একদিন হবেই।”

“আদালত রায়ে উল্লেখ করেছেন, ‘মিন্নি এ হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনাকারী’। কিন্তু মিন্নি কোথায় পরিকল্পনা করেছে? পরিকল্পনা যারা করেছে, তারা কলেজসহ বিভিন্ন স্থানে পরিকল্পনা করেছে। কিন্তু এসবের সঙ্গে তো মিন্নি ছিল না। মিন্নি যদি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকত বা কোনোভাবেই এটা জানতে পারত তাহলে কখনোই ওই দিন কলেজে যেত না।”

মোজাম্মেল হোসেন কিশোর বলেন, ‘মৃত্যুর আগে রিফাত তার বাবার কাছে হামলাকারীদের নাম বলেছে এবং মামলায় মিন্নিকে সাক্ষী করতে বলেছে। রিফাতের কথা অনুযায়ী তার বাবা মামলা দায়ের করেছেন এবং মামলার এজাহারে এসব কথা স্পষ্টভাবে লেখা আছে। এ ছাড়াও রিফাতের বাবা দুলাল শরীফ যে সাক্ষী দিয়েছেন তাতেও এসব কথা উঠে এসেছে। পরবর্তীতে পুলিশ প্রভাবিত হয়ে বিভিন্ন ধরনের সাক্ষী উপস্থাপন করে মিন্নিকে দোষী সাব্যস্ত করেছে। মিন্নি আসলেই নির্দোষ। তাই আমি দৃঢ় আশাবাদী, আল্লাহর রহমতে উচ্চ আদালতে আমরা সুফল পাব। আল্লাহর রহমতে মিন্নি আবার আমাদের মাঝে ফিরে আসবেই।’

মিন্নির শারীরিক অবস্থা প্রসঙ্গে মোজাম্মেল হোসেন কিশোর বলেন, ‘মিন্নির বুকে ব্যথা ও মাথা ব্যথাসহ অন্যান্য অনেক উপসর্গ আছে। মিন্নি খেতে পারে না, ঘুমাতে পারে না। সব সময় অসুস্থ থাকে। তাই খুবই দুর্বল হয়ে গেছে। কারাগারের পানি পর্যন্ত ওর সঙ্গে অ্যাডজাস্ট হয় না। মিন্নির চিকিৎসার জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আবেদন করেছে কারা কর্তৃপক্ষ। এ আবেদন অনুমোদিত হলে মিন্নিকে বাইরে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হবে।’

‘দীর্ঘদিন কারাগারে থাকার কারণে মিন্নিকে চেনা এখন দুষ্কর ব্যাপার। মিন্নি কোনোদিন কোনো অভাব দেখেনি। ওর খাওয়ার অভাব ছিল না, পরার অভাব ছিল না, কোনো শূন্যতাও ছিল না। মিন্নিকে আমি কলেজে নিয়ে যেতাম আবার কলেজ থেকে নিয়ে আসতাম। কেউ বলতে পারবে না, কোনোদিন মিন্নি একা বাইরে বের হয়েছে। মিন্নি আজ মা-বাবা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন থেকে দূরে। ওকে (মিন্নিকে) কারাগারের সেলে আবদ্ধ থাকতে হয়। তাই খুব কষ্টে জীবনযাপন করছে মিন্নি।’

রিফাত হত্যা মামলার রায়ের পর গত বছরের ২৯ অক্টোবর বরগুনা জেলা কারাগার থেকে মিন্নিকে গাজীপুরের কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। এরপর থেকে এ কারাগারেই রয়েছেন তিনি। করোনার কারণে বন্দিদের সঙ্গে স্বজনদের সাক্ষাৎ বন্ধ থাকায় প্রতি সপ্তাহে একবার স্বজনদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পান মিন্নি।

মিন্নির অসুস্থতা ও চিকিৎসার বিষয়ে জানতে কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার হালিমা খাতুনের ব্যবহৃত সরকারি মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়। তাই এ বিষয়ে তাঁর মন্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর বরগুনার মো. শাহনেওয়াজ রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় তাঁর স্ত্রী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নিসহ ছয় আসামির ফাঁসির আদেশ দিয়েছিলেন আদালত। খালাস পেয়েছেন চারজন। বরগুনা জেলা ও দায়রা জজ মো. আছাদুজ্জামান এ রায় ঘোষণা করেন।

মৃত্যুদণ্ডাদেশ পাওয়া আসামিরা হলেন রাকিবুল হাসান রিফাত ওরফে রিফাত ফরাজী (২৩), আল কাইয়ুম ওরফে রাব্বি আকন (২১), মোহাইমিনুল ইসলাম সিফাত (১৯), মো. রেজওয়ান আলী খান হৃদয় ওরফে টিকটক হৃদয় (২২), মো. হাসান (১৯) ও আয়শা সিদ্দিকা মিন্নি (১৯)।

মামলা থেকে খালাস পেয়েছেন মো. মুসা (২২), রাফিউল ইসলাম রাব্বি (২০), মো. সাগর (১৯) ও কামরুল হাসান সাইমুন (২১)। আসামিদের মধ্যে আয়শা সিদ্দিকা মিন্নি হাইকোর্ট থেকে জামিনে ছিলেন। আর মো. মুসা হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই পলাতক।

২০১৯ সালের ২৬ জুন বরগুনা সরকারি কলেজের প্রকাশ্যে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয় রিফাত শরীফকে। মামলার প্রধান আসামি মো. সাব্বির আহম্মেদ নয়ন ওরফে নয়নবন্ড ২০২০ সালের ২ জুলাই ভোররাতে পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন।

Leave A Reply

Your email address will not be published.