ওজন কমানোর খাবারই হতে পারে ওজন বৃদ্ধির কারণ

খাবারের মোড়কে ‘ডায়েট ফুড’ লেখা থাকলেও সেই খাবার খেয়ে আপনার ওজন আরও বাড়তে পারে। আসলে খাবারের মোড়কে ‘ডায়েট ফুড’ লেখা থাকা মানেই যে তা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হবে তা কিন্তু নয়। এজন্য খাবার খাওয়ার আগে এর পুষ্টি মূল্য যাচাই ও খাবার সম্পর্কে সঠিক ধারণা রাখা জরুরি, অন্যথায় বাড়তে পারে ওজন।

স্বাস্থ্য বিষয়ক একটি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত রিপোর্ট অবলম্বনে ওজন বাড়ায় এমন কিছু ‘ডায়েট ফুড’ সম্পর্কে জানানো হল। ডায়েট সোডা বা কোকঃ ক্যালরি বিহীন কোমল পানীয় পান করে ডায়েট থেকে শর্করা বাদ দেওয়ার মতো কাজ অনেকেই করে থাকেন। এটা যেমন ওজন কমাতে পারে তেমনি আবার ওজন বাড়াতেও পারে। অনেকে বেশি খাবার খাওয়ার পরে তা হজমের জন্য কোমল পানীয় পান করে থাকেন, যা হতে পারে হিতে বিপরীত।

টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের হেলথ সায়েন্স সেন্টার ৪৭৫ জনের ওপর ১০ বছর পর্যবেক্ষণ চালিয়ে জানায়, অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে যারা ডায়েট সোডা পান করেন তাদের কোমরের পরিধি ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে যারা সোডা পান করে না তাদের তুলনায়।

গবেষকরা মনে করেন, কৃত্রিম শর্করা যেমন- অ্যাসপার্টাম, স্যাকারিন বা স্লেন্ডা একটা ভূমিকা রাখতে পারে। হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের হার্ভার্ড স্বাস্থ্য ব্লগের পরামর্শ দেয় যে, এই অতি-মিষ্টি রাসায়নিকগুলো শরীরে কোনো রকম ক্যালরি যোগ করে না। আমাদের শরীর পুষ্টিকর খাবারের চেয়ে অনেক বেশি মিষ্টি-জাতীয় খাবারের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করায়।

মিষ্টি কোমল পানীয় থেকে ক্যালরি গ্রহণ বাদ দিতে পারলে, এই ধরনের ক্যালরি গ্রহণের প্রতি আকর্ষণও হ্রাস পেতে থাকবে, যা খাবারের চাহিদা বাড়িয়ে দিয়ে ওজন বৃদ্ধিতে সহায়তা করে- এমনটা জানা যায় ইয়েলের আণবিক, সেলুলার অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বায়োলজি বিভাগের গবেষণার লেখক কুইং ইয়াংয়ের লেখা থেকে।

কম চর্বিযুক্ত দইঃ ‘কম-চর্বি যুক্ত’ বা ‘চর্বিহীন-দই’ শুনতে স্বাস্থ্যকর লাগলেও এই চর্বির ঘাটতি পুশিয়ে দেয় প্রচুর পরিমাণ চিনি। উহাহরণ স্বরূপ দুই তিন কাপ ‘লো-ফ্যাট’ দইয়ে ১৫০ ক্যালরি ও ২২ গ্রাম শর্করা থাকে যার মধ্যে ১৭টি চিনি যোগ করা হয়।

আমেরিকান জার্নাল অব ক্লিনিকেল নিউট্রিশনে প্রকাশিত ২০১৬ সালের এক সমীক্ষায় জানা যায়, ১০০ বছর ধরে একটা বড় মহিলা দলকে অনুসরণ করে জানা গেছে যারা বেশি চর্বি যুক্ত খাবার খান তারা কম-চর্বিযুক্ত খাবার গ্রহণকারীদের চেয়ে কম ওজন ধারণ করেন।

বোতলজাত সালাদ ড্রেসিংঃ তাজা সালাদ বা সবুজ সালাদের চেয়ে পুষ্টিকর আর কি হতে পারে। এই ধরনের সালাদে যখন চর্বিহীন লেবেল করা সালাদ ড্রেসার ব্যবহার করা হয় তখন চর্বির বদলে যোগ হয় প্রচুর পরিমাণ চিনি। কেননা এই ধরনের ড্রেসারে উচ্চ মাত্রার ফ্রুক্টোজ কর্ন সিরাপ মেশানো হয়।

পানির পরে এই সকল সিরাপ দ্বিতীয় জনপ্রিয় প্রাচুর্যক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সালাদ তৈরিতে ব্যবহৃত সবজিতে থাকা বেশ কিছু অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট-ক্যারোটেনয়েড চর্বিতে দ্রবণীয়। অর্থাৎ এই সকল খাবার শরীরে শোষিত হতে চর্বির প্রয়োজন। প্রতি দুই চামচ সালাদ ড্রেসার খেলে তিন-চার গ্রাম চিনি দেহে যোগ হয়। আর বাস্তবতা হলো, আপনি খাওয়ার সময় পরিমাণের চেয়ে বেশি সালাদ ড্রেসারই যোগ করবেন।

 

গমের রুটিঃ রুটির লেবেলের ওপরে ‘গমের তৈরি’ লেখা দেখলেই চট করে কিনে ফেলবেন না। গমের তৈরি মানে কেবল গমেরই তৈরি। কিন্তু উৎপাদনকারীরা তাদের পণ্যে অন্যান্য উপাদান ব্যবহার করেও নাম হিসেবে স্বাস্থ্যকর শব্দ ‘গম’ ব্যবহার করছেন।

সাদা গমের মানে হলো এর থেকে পুষ্টিকর আঁশ আলাদা করা হয়েছে অর্থাৎ আপনি কেবল সাদা রংয়ের রুটিই পাচ্ছেন। এতে গমের কোনো পুষ্টিগুণ নেই। তাই পণ্য কেনার আগে ভালো মতো দেখে নিন এতে ‘পুরো গম’ বা ‘সম্পূর্ণ শষ্য’ লেখা আছে কিনা।

দ্বিতীয়ত, ‘লাইট’ শব্দটি দিয়ে বোঝায় এতে ক্যালরি কম। কারণ এর থেকে চর্বিযুক্ত পুষ্টি উপাদান আলাদা করা হয়েছে। আর মিষ্টি যোগ করা হয়েছে যাতে উচ্চ ফ্রুকটোজ কর্ন সিরাপ থাকে। তাই ‘হোল গ্রেইন’ গমের তৈরি রুটি খাওয়া ভালো। এতে বেশি ভিটামিন, আঁশ ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান থাকে

দই সংরক্ষণঃ স্বাস্থ্যকর খাবার সংরক্ষণের জন্য অনেকেই ফ্রিজে স্ট্রবেরি বা অন্যান্য ফলের টুকরা দিয়ে সাজানো দই সংরক্ষণ করে থাকেন। ক্ষুধা মেটাতে স্নিকার্স বা অন্য চকলেটের বদলে এই ধরনের দই খাওয়াকে উপকারী মনে করে থাকেন। কিন্তু এতে সমপরিমাণ ক্যালরি ২৮০ ও ২৮ গ্রাম শর্করা দেহে যোগ হয়। তাই দই খেতে চাইলে ওজন কমাতে সক্ষম এমন পুষ্টিকর দই খাওয়া উচিত।

এনার্জি ও প্রোটিন বারঃ ওজন কমাতে প্রোটিনের উপকারিতার কথা সবাই জানেন। তবে উচ্চ প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবারে যে প্রচুর পরিমাণে ক্যালরি ও শর্করা যোগ করা হয় তা অনেকেই ভুলে যান। শক্তি বাড়াতে ও প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে যেসকল খাবার বাজারে কিনতে পাওয়া যায় তা পুষ্টির আড়ালে দেহে বাড়তি শর্করা ও ক্যালরি যোগ করে।

পপকর্নঃ ভুট্টা ভাজা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী, এতে আঁশও রয়েছে প্রচুর। তাই বলে যে কোনো পপকর্নই স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী নয়।

ইউ ক্যান ড্রপ ইটয়ের লেখক ইলানা মাহালস্টেইন বলেন, সিনেমা হলে যে ধরনের নোনতা বা মসলাদার পপকর্ন খেয়ে থাকি তা লবণযুক্ত তেল খাওয়ার মতোই।

মাইক্রোওয়েভ পপ কর্নে ‘মাখনের স্বাদ’ বা ‘ক্যারামেল’ স্বাদ যোগ করা হলে তা প্রতিবার খাওয়ার সময় ৬ গ্রাম স্যাচুরেইটেড তেল সরবারহ করে যা দৈনিক চাহিদার ৩০ শতাংশ। তাই এটা খাওয়ার আগে অবশ্যই পুষ্টিমান যাচাই করে নেওয়া উচিত।

আরও পড়ুন
Loading...