বাঙালির নারী দিবসে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করতে হয় এমন তিনজন নারী

১৯১০ সালে ১৭টি দেশের শতাধিক নারী একটি দিনকে নারী দিবস হিসেবে পালনের আহ্বান জানায়। এর এক বছর পরই অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক, জার্মানি এবং সুইজারল্যান্ডের মতো দেশগুলো নারী অধিকার আদায়ে সোচ্চার হয়ে উঠে এবং বিশ্বব্যাপী নারী দিবস পালনের আহ্বান জানায়। সিদ্ধান্ত হয় ১৯১১ খ্রিস্টাব্দ থেকে নারীদের সম-অধিকার দিবস হিসেবে দিনটি পালিত হবে। দিবসটি পালনে এগিয়ে আসে বিভিন্ন দেশের সমাজতন্ত্রীরা।

১৯১৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে বেশ কয়েকটি দেশে ৮ মার্চ পালিত হতে শুরু করে। এরপর জাতিসংঘ ১৯৭৫ সালে ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রদান করে হয়।এমনকি দিবসটি পালনের জন্য বিভিন্ন রাষ্ট্রকে আহ্বান জানায় জাতিসংঘ। এরপর থেকে পুরো পৃথিবী জুড়েই নারীর সমঅধিকার আদায়ের দাবিতে পালিত হচ্ছে দিনটি। বাংলাদেশে প্রথম নারী দিবস পালিত হয় ১৯৭১ সালের ৮ মার্চ। এরপর থেকে প্রতিবছরই নারীদের সম্মান জানিয়ে দিবসটি পালন করে আসছে বাঙালিরা। বাঙালির নারী দিবসে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করতে হয় সেই সব কীর্তিমান নারীদের। আর সেই সব নারীরা হলেন-
 বেগম রোকেয়া

বেগম রোকেয়া

বেগম রোকেয়া

রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, যিনি বেগম রোকেয়া হিসেবেই বেশি পরিচিত। বাঙালি নারী জাগরণ ও নারীর অধিকার আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ তিনি। তিনি ছিলেন ঊনবিংশ শতাব্দীর বিখ্যাত সাহিত্যিক, শিক্ষাব্রতী, সমাজসংস্কারক। বাংলার নারী জাগরণে এবং সমাজের সংস্কারে তার ভূমিকা অসামান্য। বাঙালি মুসলমান সমাজের এই যে নারী-পুরুষের অসঙ্গতির বিরুদ্ধে প্রথম যে কণ্ঠটি আওয়াজ তুলেছিল, সেটি বেগম রোকেয়ার। তিনি বাঙালি মুসলমানদের নব জাগরণের সূচনা লগ্নে নারী শিক্ষা ও নারী জাগরণে নেতৃত্ব দেন।

বেগম রোকেয়ার বিশেষ গ্রন্থ পদ্মরাগ, অবরোধবাসিনী ও মতিচুর। তার উল্লেখযোগ্য রচনা সুলতানার স্বপ্ন। মৃত্যুর আগে বেগম রোকেয়া একটি অসমাপ্ত প্রবন্ধ রেখে যান। এর নাম ‘নারীর অধিকার’। বেগম রোকেয়া তার লেখনিতে নারীবৈষম্য প্রতিরোধে সোচ্চার হয়েছেন। সামাজিক সচেতনতা ও নারী-পুরুষ সমানাধিকার বিষয়ে হয়েছেন স্পষ্টবাদী। বেশ কয়েকটি স্কুল পরিচালনা ও সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বেগম রোকেয়া নিজেকে সাংগঠনিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত রাখেন।

১৯১৬ সালে তিনি মুসলিম বাঙালি নারীদের সংগঠন ‘আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলাম’ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর রংপুর জেলার মিঠাপুকুর থানার পায়রাবন্দ গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম জমিদার পরিবারে জন্ম নেন তিনি। মাত্র বায়ান্ন বছর বয়সে নারী জাগরণের অগ্রদূত মহিয়সী নারী ১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বর কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন।

জাহানারা ইমাম

জাহানারা ইমাম

জাহানারা ইমাম

বাঙালি জাতির যেকোনো ক্রান্তিলগ্নে আলোর মশাল হাতে পথ দেখিয়েছেন জাহানারা ইমাম। তার হাতে গড়া গণআদালতের মাধ্যমেই বাংলাদেশে শুরু হয় একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রক্রিয়া। শহীদ জননী জাহানারা ইমাম একাধারে কথাসাহিত্যিক ও বাংলাদেশের একজন শিক্ষাবিদ ছিলেন। একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটিরও সংগঠকও ছিলেন তিনি। বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে জন্ম নেন জাহানারা ইমাম। তার শৈশবে মুসলিম পরিবারের মেয়েদের কাছে আধুনিক শিক্ষালাভের দ্বার উন্মুক্ত ছিল না।

তবে তিনি তার ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট বাবার আবদুল আলীর তত্ত্বাবধানে রক্ষণশীলতার বাইরে এসে আধুনিক শিক্ষা লাভ করেছিলেন। বিবাহিত জীবনে লেখাপড়ায় তিনি পুরকৌশলী স্বামী শরীফ ইমামের দিক থেকেও উৎসাহ ও আনুকূল্য পেয়েছিলেন। নারীর কল্যাণে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন তিনি। একাত্তরে তার ছেলে শাফী ইমাম রুমী দেশের মুক্তিসংগ্রামে অংশ নেন, কয়েকটি সফল গেরিলা অপারেশনে অংশ নেন তিনি। যুদ্ধচলাকালে শহীদ হন। পরবর্তীতে স্বাধীনদেশে তাকে ‘শহীদ জননী’ উপাধি দেয়া হয়।

জাহানারা ইমামের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘একাত্তরের দিনগুলি’। ১৯৮১ সালে তিনি মুখের ক্যান্সারে আক্রান্ত হন, কিন্তু শারীরিক ভাবে অসুস্থ থাকার পরও থেমে থাকেননি, সকল ব্যথা-বেদনা উপেক্ষা করে তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির কর্মকাণ্ড সমান উৎসাহে চালিয়ে যেতে থাকেন। ১৯৯৪ সালের ২৬ জুন আমেরিকার মিশিগান স্টেটের ডেট্রয়েটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার জীবনাবসান ঘটে। সেখান থেকে ঢাকায় এনে তাকে সমাহিত করা হয়।

বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার

বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার

ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার বাঙালি নারীর সাহসের বাতিঘর। তার জন্ম অগ্নিযুগের বীরকন্যা প্রীতিলতা যুগে যুগে বাংলার নারীদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে রয়েছেন, ভবিষ্যতেও থাকবেন। প্রীতিলতা আমাদের উজ্জীবিত করে সেই সময়ে সমাজের শত বাধা ও রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে দেশমাতৃকার জন্য স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন। বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার নারী আন্দোলনের পুরোধা ছিলেন। তৎকালীন পূর্ব-বঙ্গে জন্ম নেয়া এই বাঙালি বিপ্লবী সূর্য সেনের নেতৃত্বে তখনকার ব্রিটিশ বিরোধী সশস্ত্র আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন এবং জীবন বিসর্জন দেন।

চট্টগ্রামের ১৯৩২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর রাতে কয়েকজন বিপ্লবীকে সঙ্গে নিয়ে প্রীতিলতা চট্টগ্রামের পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাবে ইংরেজদের ওপর আক্রমণ করেন। এই ক্লাবের সামনে লাগানো সাইনবোর্ডে লেখা থাকতো ‘কুকুর ও ভারতীয়দের প্রবেশ নিষেধ’। অভিযান শেষে ফেরার সময় তার গায়ে একটি গুলি লাগে। এরপর ইংরেজদের হাতে ধরা পড়ার আগে তিনি নিজের পকেটে থাকা পটাশিয়াম সায়ানাইড পান করে আত্মাহুতি দেন।

১৯১১ সালের ৫ মে চট্টগ্রামের বর্তমান পটিয়া উপজেলার ধলঘাট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ইডেন মহিলা কলেজ ও কলকাতার বেথুন কলেজের এই ছাত্রী। এছাড়া আরো অনেক মহীয়সী বাঙালি নারীর উন্নয়নে এবং সমাজের কুসংস্কার ও পশ্চাতপদতা দূরীকরণে ভূমিকা রেখেছেন। তাদের কল্যাণ আর সাহসেই বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়ন হচ্ছে।

আরও পড়ুন
Loading...