ঘুরে আসুন শীতলক্ষ্যা পাড়ের নারায়ণগঞ্জ

নিজস্ব প্রতিনিধি: পদ্মা, মেঘনা, ধলেশ্বরী আর শীতলক্ষ্যা নদী বয়ে গেছে নারায়ণগঞ্জ জেলার ওপর দিয়ে। পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতিবসু এই জেলার সোনারগাঁওয়ে ১৯১৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন। সোনারগাঁও ছিল এক সময় রাজধানী। ইতিহাস ও ঐতিহ্য ছড়িয়ে রয়েছে এই নারায়ণগঞ্জ জেলায়। উপজেলার সংখ্যার ৭টি। এগুলো হলো নারায়ণগঞ্জ সদর, ফতুল্লা, আড়াইহাজার, সোনারগাঁও, রূপগঞ্জ, বন্দর আর সিদ্ধিরগঞ্জ। এ জেলার আয়তন প্রায় ৭৫৯ বর্গকিলোমিটার। হিন্দুধর্মীয় দেবতা নারায়ণ ঠাকুরের নামানুসারে নারায়ণগঞ্জ নামকরণ করা হয়েছে। এই জেলায় আছে ঈশাখাঁর দুর্গ এবং বিবি মরিয়মের মাজার।
যেভাবে যাবেন : ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ যাওয়ার জন্য ৫ মিনিট পর পর পরিবহন ছেড়ে যায় গুলিস্তান, মতিঝিল, ডিআইটি থেকে। সময় লাগে ৪০ মিনিট। সড়কপথে ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জের দূরত্ব ১৭ কিলোমিটার। রেলপথে দূরত্ব ২৩ কিলোমিটার। ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ যায় এমনি কয়েকটি পরিবহন হলো বন্ধন এসি, বন্ধন নন-এসি, উৎসব এসি, সেতু প্রভৃতি। এসব পরিবহন ছাড়ে মতিঝিল ডিআইটির পাশ থেকে।
যেখানে থাকবেন : রাত যাপন করার জন্য নারায়ণগঞ্জে বেশ কয়েকটি হোটেল রয়েছে, যেমনÑ খাজা গরীবে নেওয়াজ রেস্ট হাউজ, মিনা হোটেল, হোটেল পলাশী, হোটেল সুরমা।ঢাকার কাছে নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দর হিসেবে সমধিক খ্যাত। এখানকার দুর্গ, তোলারাম কলেজ, কদমরসুল আপনাকে ভীষণভাবে আকৃষ্ট করবে। ঢাকা থেকে সকালে রওনা করে সারাদিন নারায়ণগঞ্জ ঘুরেফিরে দেখে সন্ধ্যায় ফিরে আসতে পারবেন। কিন্তু বন্দর শহর নারায়ণগঞ্জ দেখে কিছুতেই ফিরে আসতে মন চাইবে না। তিন থেকে চারদিন ভ্রমণ করে কিংবা একদিনেই উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য কীর্তিগুলো দেখে নিন।
শহরের উত্তরদিকে শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে একটি দুর্গ দেখবেন। এটি ঈশা খাঁ নির্মাণ করেছিলেন। নিচে থেকে যাত্রাপথে সুড়ঙ্গপথ তৈরি করেছিলেন। এই সুড়ঙ্গ দিয়ে লালবাগ দুর্গে যাওয়া যেত। এখানে মিনার ছাড়াও মসজিদ দেখতে পাবেন।


দুর্গ দেখে বিবি মরিয়মের মসজিদ ও মাজার দেখতে চলে যান। এই দুর্গ থেকে কিছু দক্ষিণে অবস্থিত মরিয়মের মসজিদটি বাংলার সুবেদার নবাব শায়েস্তা খান তাঁর কন্যার নামে তৈরি করেছিলেন। সোনাকান্দা দুর্গটি প্রায় দুশো শতাংশ জমির উপর নির্মাণ রা হয়েছিল। চারদিকেই দেয়ালে ছোট ছোট ‘দূরদৃষ্টি ঘর’ দেখতে পাবেন। এই ফাঁক দিয়ে সৈন্যরা দূর থেকে কেউ আসছে কি না তা লক্ষ্য করত। নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীর পূর্বতীরে সোনাকান্দা দুর্গ। সতেরো শতকের প্রথমদিকে মগ ও পর্তুগিজ জলদস্যুরা জাহাজে করে বাংলাদেশে এসে ডাকাতি করত। তাদেরকে ঠেকাবার জন্য সোনাকান্দা দুর্গ তৈরি করা হয় সতেরো শতকের প্রথম দিকেই।
কামান রাখার স্থানটি দেখে নিন। জায়গাটা খুব উঁচু। এর চারদিকেও দেয়াল রয়েছে। মাঝখানে এক বিরাট মাঠ দেখবেন।
নারায়ণগঞ্জের প্রাচীন শাহী মসজিদটিও আকর্ষণীয়। শাহী মসজিদ ঈশা খাঁর বিস্ময়কর অবদান। এটি বাংলার প্রাচীন মসজিদগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি।
শীতলক্ষ্যার ওপারেই নবীগঞ্জে কদমরসুল। এখানে গেলে প্রথমে নজরে পড়বে একটি বিরাট দোতলা ইমারত। এখানে দুইখ- পাথরের ওপর দুটি পায়ের ছাপ দেখতে পাবেন। লোকমুখে জানবেন, এতে নাকি হয়রত মোহাম্মদ মোস্তফার (দ.) পায়ের ছাপ আছে। কদমরসুল ঘুরে দেখতে গিয়ে মনটা পবিত্রতায় ভরে উঠবে। জানা যায়, ঈশা খাঁর প্রপৌত্র দেওয়ান মনোয়ার খান এখানে একটি ইমারত তৈরি করেন। সেটি নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে ঢাকায় বসবাসকারী এবং কুমিল্লার জমিদার গোলাম নবী সেই বিখ্যাত ইমারতকে নতুন করে তৈরি করেন। এরপরে ১৮১৪ সালে পশ্চিমদিকের দোতলা তোরণটি তৈরি করা হয়।
এবার ফিরে আসুন নারায়ণগঞ্জে। তোলারাম কলেজ, পাটের গুদাম, রেলস্টেশন ঘুরে ঘুরে দেখুন। নদীর ঘাটে রয়েছে লঞ্চ আর নৌকার ছড়াছড়ি। শীতলক্ষ্যায় নৌবিহারও করতে পারেন।
কবি বেনজীর আহমেদের জন্ম ১৯০৩ সালে নারায়ণগঞ্জের ধনুয়া গ্রামে। এখানেও আসতে পারেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ হলো ‘বন্দীর বাঁশি’ ও ‘বৈশাখী’।
বন্দরশাহী মসজিদ : এ মসজিদটি নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে অবস্থিত। এর কাছেই তৎকালীন রাজধানী সোনারগাঁও অবস্থিত। সুলতান মাহমুদ শাহের পুত্র সুলতান জালালউদ্দিন ফতেহ শাহের রাজত্বকালে ১৪৮১ খ্রিস্টাব্দে বাবা সালেহ কর্তৃক এ মসজিদটি নির্মিত হয়। মসজিদ-শীর্ষে একটি বিশালাকৃতির গম্বুজ রয়েছে।

ঈসা খাঁর রাজধানী সোনারগাঁও
ঢাকা শহর থেকে সোনারগাঁও ১৫ মাইল পূর্বদিকে অবস্থিত। এককালে এর পশ্চিমদিক দিয়ে বয়ে যেতে ব্রহ্মপুত্র নদ। এর একটু দূরেই মেঘনা নদী। প্রাচীনকালে সেই হিন্দু-বৌদ্ধযুগে এখানে একটি নগরী ছিল। সেই নগরীর নাম ছিল সুবর্ণগ্রাম অর্থাৎ সোনার গ্রাম। কালক্রমে এই স্থানটি তার অতীত গৌরব ধরে রাখতে পারেননি। মুসলমান আমলের প্রথমদিকেই এখানে আবারও একটি শহর গড়ে ওঠে। ১৩৩৮ খ্রিস্টাব্দে বাংলার সুলতান ফখরুদ্দীন মোবারক শাহ সোনারগাঁওয়ে তাঁর রাজধানী স্থাপন করেন। তিনি এখান থেকে মুদ্রারও প্রচলন করেন। ১৫৮৬ খ্রিস্টাব্দের আগে ও পরে এখানে অতি মূল্যবান মসলিন কাপড় তৈরি হতো। ঈসা খাঁর রাজধানীও ছিল এই সোনারগাঁওয়ে। মোঘলদের আমলে ১৬০৮ খ্রিস্টাব্দে ঢাকা শহরকে বাংলার রাজধানী করা হয়। এরপরেই সোনারগাঁওয়ের অবনতি ঘটে।
সোনারগাঁওয়ের রয়েছে দালানকোঠা, মসজিদ, মাজার। সুলতান জালালউদ্দীন। ফতেশ শাহর আমলে নির্মিত মসজিদটি দেখার মতো। প্রাচীন কবরস্থান, টাঁকশাল, নহবতখানা, খানকা শরীফ, মাজার রয়েছে এখানে। সোনারগাঁও থেকে প্রায় দেড় মাইল দূরে রয়েছে গিয়াসউদ্দীন আজম শাহ’র সমাধি। এরই একটু দূরে পাঁচপীরের মসজিদ ও মাজার। এখানের গোয়ালদিহি মসজিদটিও দেখবার মত। সুলতান হোসেন শাহর আলে ১৫১৯ খ্রিস্টাব্দে এই সুন্দর মসজিদটি তৈরি করা হয়। শাহ আবদুল হামিদের মসজিদ তৈরি হয় ১৭০৫ খ্রিস্টাব্দে। এটি দেখে লোকশিল্প জাদুঘরে আসুন।
সোনারগাঁ জাদুঘর : সপ্তাহে বুধ ও বৃহস্পতিবার জাদুঘর বন্ধ থাকে। শুক্রবার দুপুর সাড়ে বারোটা থেকে আড়াইটা পর্যন্ত শুধুমাত্র গ্যালারি বন্ধ থাকে। জাদুঘরে প্রবেশ টিকেট মূল্য ১০ টাকা মাত্র। গ্যালারি পরিদর্শন ফ্রি। সোনারগাঁ জাদুঘরে ৪ হাজার ৩০০টি নিদর্শন দ্রব্য রয়েছে। ৩টি পিকনিক স্পট রয়েছে। অক্টোব থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত পিকনিক মৌসুমে প্রতি স্পটে দৈনিক ভাড়া নেয়া হয় ৩ হাজার টাকা করে।
এখানে লেক, পুকুর ও জলাশয় রয়েছে। লেকে বড় সাইজের মাছ আছে। প্রতি টিকেটে ৫০ টাকা বঁড়শিতে মাছ ধরা যাবে। এ জন্য দেড় হাজার টাকা মূল্যে টিকেট সংগ্রহ করা যায়।
লেকে নৌকায় বেড়ানোর ব্যবস্থা আছে। ঘণ্টায় ৫০ টাকা ভাড়ায় নৌকায় ভ্রমণ করা যায়। প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসে এখানে লোক কারুশিল্প মেলা ও লোকজ উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। তখন এলে সাপের লড়াই, মোরগ লড়াই, কুস্তি খেলা, এক্কাদোক্কা, হা-ডু-ডু, দাঁড়িয়াবান্দা খেলা দেখা যায়।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মোগরাপাড়া বাস স্টপেজ থেকে বামদিকে যে রাস্তাটি চলে গেলে এটির বেশ খানিকটা ভিতরে মেঘনা, শীতলক্ষ্যা আর ব্রহ্মপুত্রÑ এই তিন নদীর মোহনায় অবস্থিত এই সোনারগাঁও। তিন নদীর সংযোগস্থলে অবস্থানের জন্য সামরিক দিক থেকে এই সুপ্রাচীন নগরীর গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। সে কারণে সোনারগাঁও একই সঙ্গে মধ্যযুগীয় পূর্ববাংলার রাজধানী ও বন্দরনগরীর মর্যাদা পেয়েছিল। তরুণ তুর্কিযোদ্ধা ইখতিয়ার খিলজি ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে বাংলা বিজয় করেছিল। তারপর ১০০ বছর কাল ধরে দিল্লির সুলতানগণ গর্ভনরের মাধ্যমে বাংলা শাসন করেন। মোঘলসম্রাট আকবরের শাসনকাল পর্যন্ত বাংলা দুভাগে বিভক্ত ছিল। পশ্চিমভাগের রাজধানী ছিল গৌড় আর পূর্বভাগের রাজধানী ছির সোনারগাঁওয়ে। সোনারগাঁওয়ের রাজা ছিল রায় দনুজ। ১৩৩৮ খ্রিস্টাব্দে পূর্ব বাংলার একটি পৃথক রাজ্য হিসেবে সোনারগাঁও প্রতিষ্ঠা লাভ করে। সোনারগাঁওয়ের প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রথম স্বাধীন সুলতান ছিলেন ফখরুদ্দিন মুবারক শাহ।
মোঘল সম্রাটরা ঢাকায় বাংলার রাজধানী প্রতিষ্ঠা করার পরই সোনারগাঁওয়ের রাজনৈতিক গুরুত্েব ভাটা পড়ে। তবুও অতীত ঐতিহ্য হিসেবে সোনারগাঁওয়ে তৈরি বিখ্যাত মসলিন বস্ত্র আজো তার শিল্পীদের অপূর্ব কলাকৌশল আর নৈপুণ্যের কথা এখনো অনেকে স্মরণ করেন। সোনারগাঁওয়ের ছিল স্বাধীন সুলতানদের অনন্যসুন্দর টাকশাল। সোনারগাঁও টাকশালে তৈরি বিভন্ন মুদ্রা আজো বাংলাদেশ জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে। এখােেন রয়েছে ৪ ফুট উঁচু মঞ্চের উপর অবস্থিত একই সারিতে ৫টি সমাধি যা পাঁচ পীরের দরগাহ নামে পরিচিত। গিয়াসউদ্দীন আজম শাহের সমাধিও রয়েছে এই সোনারগাঁয়ে। তিনি ছিলেন একজন প-িত ব্যক্তি। আরো রয়েছে শেখমুহম্মদ ইউনুস ও তার পুত্র শেখ মাহমুদের স্মৃতিসৌধের ধ্বংসাবশেষ। এই স্মৃতিসৌধগুলো আয়তাকার এবং গম্বুজগুলো দেখতে পিরামিডের মতো। পাশেই রয়েছে ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দে জালালউদ্দীন ফতেহ শাহ নির্মিত এক-গম্বুজ বিশিষ্ট বর্গাকৃতি মসজিদ।

print

Facebook Comments

৪৪ বার পঠিত