আজ বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে ধ্রুবতারার মত দীপ্ত একটি দিন ১৭ এপ্রিল

তিমির চক্রবর্ত্তী : বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে ধ্রুবতারার মত দীপ্ত একটি দিন আজ ১৭ এপ্রিল।এ দেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে, বাঙ্গালি জাতির জীবনে দিনটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং ঐতিহাসিক । ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর আ¤্রকাননে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার স্বাধীনতার যে সূর্য অস্তমিত হয়েছিল বাঙালীর সেই স্বাধীনতার সূর্য আবারও উদিত হয়েছিল ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মেহেরপুর ভবেরপাড়া গ্রামের বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে। ১৯৭১ সালে এইদিনে কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুর মহাকুমার (বর্তমানে মেহেরপুর জেলা) মুজিবনগর বৈদ্যনাথতলায় আম্রকাননে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী সরকার শপথগ্রহণ করে।এই সরকারের অধীনেই আমাদের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয় এবং ৯ মাস যুদ্ধের পর দেশ স্বাধীন হয়। মুক্তিযুদ্ধকে সফল পরিণতিতে পৌঁছে দিতে মুজিবনগর সরকারের ভূমিকা অপরিসীম। এরপর থেকে দিনটি পালিত হয়ে আসছে মুজিবনগর দিবস হিসেবে। তৎকালীন মেহেরপুর মুক্ত এলাকা হওয়ার কারণে স্থানটিকে শপথগ্রহণের জন্যে বেছে নেওয়া হয়। যুদ্ধ পরিচালনা ও পাক হানাদার বাহিনীকে স্বদেশ ভূমি থেকে বিতাড়িত করে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশিত পথে মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের জন্য মুজিবনগর সরকার গঠন করা হয়।১৯৭০ সালের নির্বাচনের পর পাকিস্তানি শাসকচক্র নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে চায়নি। এ কারণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে এদেশের আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা,কৃষক, শ্রমিক ,জনতা বাংলাদেশের স্বাধীনতার পতাকা হাতে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার শপথ গ্রহণ করে। তখনই মুজিবনগর সরকার গঠন করার প্রয়োজনীয়তা বাঙালি উপলব্ধি করেছিল।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপ-রাষ্ট্রপতি (বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি), তাজউদ্দিন আহমেদকে প্রধানমন্ত্রী, ক্যাপ্টেন এম. মনসুর আলীকে অর্থমন্ত্রী এবং এ এইচ এম কামরুজ্জামানকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর দায়িত্ব প্রদান করা হয়। কর্নেল এম এ জি ওসমানীকে প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত করা হয়। মুজিবনগর সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের পর বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ ও প্রধান সেনাপতি কর্নেল এম. এ. জি ওসমানী (পরবর্তীতে জেনারেল) বক্তব্য রাখেন। এভাবেই মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য জনগণের নির্বাচিত সংসদের নেতৃত্বে একটি সাংবিধানিক সরকার বিশ্বে আত্মপ্রকাশ করে।


১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর বর্বরোচিত হামলা চালানোর পর ১০ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী রূপে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা ঘোষণা করা হয়। অস্থায়ী সরকারের সফল নেতৃত্বে ৯ মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। এ দিন ঘোষিত ঘোষণাপত্রে ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণাকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন ও অনুমোদন করা হয়।। বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে সৈয়দ নজরুল ইসলাম বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। পবিত্র কোরান তেলওয়াতের পর বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন এবং নবগঠিত সরকারকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়।
দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন।ঐতিহাসিক স্মৃতি-বিজড়িত দিনটিকে প্রতিবারের ন্যায় এবারও আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনসহ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে স্মরণ ও পালন করছে। আজ ভোরে বঙ্গবন্ধু ভবন, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় এবং দেশের সব জেলা কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। সকাল সাতটায় বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। এরপর বনানী কবরস্থানে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী এবং রাজশাহীতে এ এইচ এম কামরুজ্জামানের কবরে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করা হয়।


২০০ বছর আগে ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর আম্রকাননে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার স্বাধীনতার সুর্য অস্ত যায়। আর ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল প্রাচীন জেলা নদীয়ার আরেক অংশে মেহেরপুর মুজিবনগরের আম্রকাননে স্বগর্বে আত্মপ্রকাশ করে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুর্য।এজন্যই দিনটি বাঙ্গালীর জন্য এক ঐতিহাসিক দিন।

print

Facebook Comments

৩৮ বার পঠিত